কর অঞ্চল-৩ এ ‘ভূয়া ঠিকানায় চাকরি’ : নৈশ প্রহরী থেকে কোটি টাকার সম্পদের মালিক— জুলহাস উদ্দিনকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

কর অঞ্চল-৩ এ ‘ভূয়া ঠিকানায় চাকরি’ ও  নৈশ প্রহরী থেকে কোটি টাকার সম্পদের মালিক জুলহাস উদ্দিন।নিজস্ব প্রতিবেদক :  ঢাকার কর অঞ্চল-৩ এ দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে কর্মরত এক নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীকে ঘিরে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা, জাল কাগজপত্র, পুলিশের ভেরিফিকেশন ম্যানেজ, আয়কর ব্যবস্থায় অনিয়ম এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে বছরের পর বছর রাষ্ট্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আসছেন মো: জুলহাস উদ্দিন আহমেদ।


বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধান কি বলছে  ?   অনুসন্ধানে জানা গেছে, মো: জুলহাস উদ্দিন আহমেদ ১৯৯৩ সালের ২৩ মে কর বিভাগে নৈশ প্রহরী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০০০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর অফিস সহায়ক (পিয়ন) পদে পদোন্নতি পান।

দীর্ঘ ২৫ বছর একই পদে দায়িত্ব পালনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর “অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক” পদে দ্বিতীয়বার পদোন্নতি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি কর অঞ্চল-৩, সার্কেল-৫৯, পুরানা পল্টনে কর্মরত।


বিজ্ঞাপন

সরকারি নথি অনুযায়ী তার বর্তমান মোট মাসিক বেতন ২২ হাজার ৪৯০ টাকা। কিন্তু এই স্বল্প আয়ের কর্মচারীকে ঘিরেই এখন উঠছে কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ।


বিজ্ঞাপন

ভুয়া ঠিকানায় সরকারি চাকরি, তারপরও স্বপদে বহাল !
অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের হাতে আসা তথ্য-উপাত্ত বলছে, চাকরিতে যোগদানের সময় জুলহাস উদ্দিন নিজেকে মানিকগঞ্জ জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে উপস্থাপন করেন।

অভিযোগ রয়েছে, জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে ওই ঠিকানা ব্যবহার করে তিনি সরকারি চাকরি বাগিয়ে নেন। পরবর্তীতে চাকরি স্থায়ী করার সময় পুলিশ ভেরিফিকেশনেও ঘুষের মাধ্যমে তদন্ত রিপোর্ট নিজেদের অনুকূলে নেওয়া হয়।

কিন্তু অনুসন্ধানে মানিকগঞ্জে তার কোনো স্থায়ী ঠিকানার অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। বরং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ঘেঁটে প্রতিবেদক জানতে পারেন, তার প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর এলাকায়।

তার পূর্বের এনআইডি নম্বর ১৯৭৩২৬৯৩৬২৫৬৮৮৭২৯ এবং বর্তমান স্মার্টকার্ড নম্বর ৬৪০০৭১৫১২১ অনুযায়ী ওই তথ্যের সত্যতা মিলেছে।

এতেই শেষ নয়। টিআইএন সার্টিফিকেট যাচাই করে রাজধানী ঢাকাতেও তার আরেকটি স্থায়ী ঠিকানার সন্ধান পাওয়া গেছে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির তিনটি স্থায়ী ঠিকানা—যা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।

একটি অনুষ্ঠানে জুলহাস উদ্দিন ও তার স্ত্রী বেশ রাজকীয় অভ্যর্থনা পেলেন।

আয়কর ব্যবস্থাতেও অনিয়মের অভিযোগ  : সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিলে নির্দিষ্ট নিয়ম থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, জুলহাস উদ্দিন সেটিও পাশ কাটিয়ে গেছেন।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ঢাকায় কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীরা অনলাইনে নতুন টিআইএন খোলার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর অঞ্চল-৪ এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত হন। কিন্তু জুলহাস উদ্দিন নিজের কর্মস্থল কর অঞ্চল-৩ হওয়ায় একই অঞ্চলের সার্কেল-৬২ থেকেই টিআইএন গ্রহণ করেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, “সব নিয়ম যেন তার জন্য আলাদা। বছরের পর বছর একই দপ্তরে থেকে তিনি এমন এক প্রভাববলয় তৈরি করেছেন, যেখানে নিয়ম ভাঙাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।” এসব বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে জুলহাস উদ্দিন স্বীকার করে বলেন, “আমার ভুল হয়েছে।”

নৈশ প্রহরী থেকে ‘কোটি টাকার সাম্রাজ্য’ !  অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও বিস্ফোরক তথ্য। ঢাকার খিলগাঁও দক্ষিণ বনশ্রী মেইন রোডের এইচ ব্লকে নিকট আত্মীয়ের নামে কোটি টাকার ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুরে নিজের ও ভাইদের নামে গড়ে তুলেছেন একাধিক রাজকীয় বাড়ি। বাড়িগুলোতে রয়েছে অভিজাত ফার্নিচার ও বিলাসবহুল সাজসজ্জা। এছাড়া আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল পরিমাণ জমি কেনার তথ্যও পেয়েছে প্রতিবেদক।

পরিবারের আর্থিক অবস্থাও প্রশ্ন তুলছে !   সাত ভাইয়ের মধ্যে এক ভাইকে পাঠানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে, আরেক ভাই অবস্থান করছেন সৌদি আরবে। নিজ ছেলে-মেয়েদের ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করানোর তথ্যও মিলেছে। জুলহাস উদ্দিনের ছেলে দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান East West University-তে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে London Metropolitan University-তে অধ্যয়নরত।
অথচ নিজের মুখেই তিনি স্বীকার করেছেন, দীর্ঘদিন তার মাসিক বেতন ছিল মাত্র ১৬ হাজার টাকার মতো।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের একটি অনুষ্ঠানে জুলহাস উদ্দিন ও তার স্ত্রীর অভিজাতদের মধ্যে নিজেদের উপস্থাপন।

প্রশ্নের মুখে ক্ষুব্ধ জুলহাস, ভাব সব  ড্যামকেয়ার :প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়—একজন নৈশ প্রহরী ও পরে পিয়ন পদে চাকরি করা ব্যক্তি কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন, তখন তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। বরং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বলেন,  “আপনারা যা পারেন নিউজ করেন !”

আরও জানতে চাওয়া হয়—লাখ লাখ টাকার জীবনযাপন, বিদেশে পড়াশোনা, জমি-ফ্ল্যাট কেনা—এসব অর্থ কোথা থেকে এলো ? কিন্তু কোনো সদুত্তর না দিয়ে তিনি এড়িয়ে যান।

দানবীর’ পরিচয়ের আড়ালেও প্রশ্ন  :  অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুলতানপুর এলাকায় বিভিন্ন খেলাধুলা, স্কুল অনুষ্ঠান ও সামাজিক আয়োজনে নিয়মিত অনুদান দিয়ে থাকেন জুলহাস উদ্দিন।

বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে বিশেষ অতিথি হিসেবেও দেখা যায়। সেখানে উপহার সামগ্রী ও নগদ অনুদান বিতরণ করতে দেখা গেছে তাকে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—একজন নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীর পক্ষে এত অর্থ ব্যয় সম্ভব কীভাবে?

সচেতন মহলের দাবি  :  সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়টি শুধু একজন কর্মচারীর অনিয়ম নয়; বরং এটি সরকারি নিয়োগ, পুলিশ ভেরিফিকেশন, কর প্রশাসন এবং সম্পদ গোপনের মতো গুরুতর প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

সচেতন মহল আরও দাবি করেন যে, জুলহাস উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।

একই সঙ্গে তার সম্পদের উৎস, একাধিক স্থায়ী ঠিকানা, টিআইএন জালিয়াতি এবং চাকরির নথিপত্র পুনরায় যাচাই করারও দাবি উঠেছে। রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে রাষ্ট্রকেই প্রতারণা করা এমন কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

👁️ 44 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *