
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীজুড়ে থ্রি-স্টার হোটেল, জমির শেয়ার ও বহুতল ভবনের স্বপ্ন দেখিয়ে শত শত মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এক ভয়ংকর প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি।

দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা নজরদারির পর অবশেষে বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় গ্রেফতার করা হয়েছে চক্রটির অন্যতম হোতা, টেলিভিশন অভিনেতা ও ‘হলিস্টিক হোম বিল্ডার্স লিমিটেড’-এর ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হায়দার কবির মিথুনকে।
রোববার (১০ মে) বিকেলে সিআইডি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, শনিবার গভীর রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় তাকে আটক করা হয়। পরে উত্তরা পূর্ব থানার প্রতারণা ও আত্মসাতের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ‘হলিস্টিক হোম বিল্ডার্স লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠানটি উত্তরখান এলাকায় ১০ কাঠা জমির ওপর জি+৯ তলা ভবন নির্মাণের প্রলোভন দেখিয়ে ৩৬টি শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেয়। প্রতিটি শেয়ারের দাম ধরা হয় ১৫ লাখ টাকা। আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, জমকালো অফিস এবং লাভজনক বিনিয়োগের আশ্বাসে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হয়।

মামলার এজাহারে উঠে এসেছে, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে বিভিন্ন সময়ে বাদী একাই ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন। তার এক বন্ধুও দেন আরও ৯ লাখ টাকা। শুধু তারা নন—এভাবে প্রায় ৪৭০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে অন্তত ১২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে চক্রটি।
গ্রাহকদের হাতে দেওয়া হয় মানি রিসিপ্ট ও চেক। কিন্তু প্রতিশ্রুত জমি বা শেয়ার হস্তান্তর তো দূরের কথা, সময় গড়াতেই বেরিয়ে আসে ভয়াবহ প্রতারণার চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া নেওয়া থ্রি-স্টার হোটেল এবং অস্তিত্বহীন বা অনিশ্চিত জমির শেয়ার বিক্রির নামে এই বিশাল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
ভুক্তভোগীরা টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাদের হুমকি-ধমকি দিয়ে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হতো। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শিশির আহমেদ আত্মগোপনে চলে যান। পরে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে পুরনো লেনদেনের দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। নতুন বোর্ড জানিয়ে দেয়, ২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের কোনো দায় তারা নেবে না।
সিআইডি বলছে, তদন্তে হায়দার কবির মিথুনের সরাসরি সম্পৃক্ততার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলা হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান, বন্ধ করে দেন ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর এবং দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে যান। তবে গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে সিআইডি। শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরার মুহূর্তেই বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এটি শুধুমাত্র একটি প্রতারণা মামলা নয়; বরং সুপরিকল্পিত আর্থিক জালিয়াতি চক্রের বড় নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত মিলছে। ইতোমধ্যে যাত্রাবাড়ী থানার একটি মামলা ছাড়াও উত্তরা পূর্ব ও পশ্চিম থানার একাধিক সিআর মামলায় হায়দার কবির মিথুনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার তথ্য পাওয়া গেছে।
সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেফতার মিথুনকে রিমান্ড আবেদনসহ আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে আত্মগোপনে থাকা চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আবাসন, হোটেল ও জমির শেয়ার ব্যবসার নামে সংঘবদ্ধ প্রতারণা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আর এই চক্রগুলো সাধারণ মানুষের স্বপ্ন, সঞ্চয় ও বিশ্বাসকে পুঁজি করেই শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এবার সেই অন্ধকার জগতের আরেকটি মুখোশ উন্মোচন করলো সিআইডি।
