ঢাকা ওয়াসা যেন ‘হিরক রাজার দেশ ’! ইব্রাহীম খলিল–জোনায়েত সিন্ডিকেটের দাপটে জিম্মি কর্মচারীরা !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক : দুর্নীতির সূতিকাগার হিসেবে বহুদিন ধরেই আলোচিত ঢাকা ওয়াসা। বিগত আওয়ামী শাসনামলে ফ্যাসিস্ট দোসর হিসেবে পরিচিত তাকসিম এ. খান চক্রের সীমাহীন লুটপাটে সংস্থাটি কার্যত তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের পটপরিবর্তনের পরও থামছে না অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাববাণিজ্য। বরং নতুন করে আলোচনায় এসেছে ওয়াসার প্রশাসন-২ বিভাগ, যেখানে উপ-সচিব পদে দায়িত্ব পাওয়া ইব্রাহীম খলিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ উঠেছে, তাকসিম এ. খান চক্রের ঘনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে পরিচিত অডিট অফিসার ইব্রাহীম খলিল পদোন্নতি পেয়ে উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা হওয়ার পর যেন হাতে পেয়ে যান ‘আলাদিনের চেরাগ’।

অল্প সময়েই গাড়ি, একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লটের মালিক বনে যান তিনি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজস্ব জোনে দায়িত্ব পালনকালে কোড বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় তার ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করেছেন বিতর্কিত কম্পিউটার অপারেটর জোনায়েত।


বিজ্ঞাপন

গত ৫ আগস্টে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলন সংগ্রামের ফলে সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের পর ওয়াসাকে সঠিক পথে ফেরাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনা হলেও রহস্যজনকভাবে বহাল থাকেন ইব্রাহীম খলিল। শুধু তাই নয়, সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা নুরুজ্জামান মিয়াজিকে সরিয়ে তাকে দেওয়া হয় প্রশাসন-২ বিভাগের দায়িত্ব—যে বিভাগকে কর্মচারীরা এখন বলছেন “হিরক রাজার দেশ”।


বিজ্ঞাপন

প্রশাসন-২ এ ‘রাবণ রাজত্ব’  !  কর্মচারীদের অভিযোগ, প্রশাসন বিভাগের দায়িত্ব পেয়েই ইব্রাহীম খলিল তার বিশ্বস্ত জোনায়েতকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন একক আধিপত্য।

গত জানুয়ারিতে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই দক্ষ কম্পিউটার অপারেটর সাজ্জাদ হোসেনকে প্রশাসন-২ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় রাজস্ব বিভাগ থেকে আনা জোনায়েতকে।

এরপর থেকেই প্রশাসন-২ এ শুরু হয় ভয়ভীতি ও প্রভাব বিস্তারের রাজত্ব। অফিস সুপার রইচ উদ্দিন এবং কম্পিউটার অপারেটর আবু সাঈদসহ একাধিক কর্মচারী অভিযোগ করেছেন, জোনায়েতের আগ্রাসী আচরণে তারা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছেন না।

কোনো কাজ না করেও কেবল ইব্রাহীম খলিলের অনুগত হওয়ায় বিভিন্ন মিটিংয়ের সম্মানী আত্মসাৎ করছেন তিনি, অথচ বঞ্চিত হচ্ছেন অন্যান্য কর্মচারীরা।

বদলি, পদোন্নতি ও নিয়োগে ‘টাকা ছাড়া নড়েনা ফাইল’ :
ওয়াসার একাধিক কর্মচারীর অভিযোগ, প্রশাসন-২ এখন কার্যত জোনায়েত নিয়ন্ত্রিত। বদলি, পদোন্নতি, এমনকি মামলার ভয় দেখিয়েও প্রভাব খাটানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে—নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি কার্যক্রমে তার মাধ্যমেই আর্থিক লেনদেন হয়।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ঠিকাদার নবায়ন, অন্তর্ভুক্তি, বিভিন্ন প্রকল্পের মাসিক চাঁদা এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে মাসোয়ারা আদায়ের মূল সমন্বয়ক হিসেবেও কাজ করছেন জোনায়েত। সংগৃহীত অর্থের ভাগ পৌঁছে দেওয়া হয় বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক এস এম মোস্তফা কামাল মজুমদার, ইব্রাহীম খলিল এবং তাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তার কাছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনে নিজের প্রভাব দেখিয়ে সাধারণ কর্মচারীদের প্রকাশ্যে হুমকি দেন জোনায়েত। তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে বদলি কিংবা মামলার ভয় দেখানো হয়। ফলে সাধারণ কর্মচারীরা এখন কার্যত “জিম্মি” হয়ে পড়েছেন।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া জোনায়েত  :  জোনায়েতের স্থায়ী নিবাস গোপালগঞ্জে। অভিযোগ রয়েছে, তার রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে সাবেক এমপি ফারুক খানের সঙ্গে।

সরকার পতনের পরও ওয়াসার সাবেক সিবিএ নেতা ও জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক আশকার ইবনে খাজা এবং আক্তারুজ্জামান মোড়লের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রয়েছে।

এছাড়া ঢাকা ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক এস এম মোস্তফা কামাল মজুমদার, সদ্য বদলি হওয়া উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল ইসলাম এবং সচিব মশিউর রহমানসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার বিশেষ সখ্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মূলত এই প্রভাববলয়ের কারণেই সাধারণ কর্মচারীরা তার অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না  :  একজন সাধারণ কর্মচারী হয়েও সবসময় বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে চলাফেরা, অফিসারদের জন্য নির্ধারিত লিফট ব্যবহার এবং সরকারি গাড়িতে চলাচল করতে দেখা যায় জোনায়েতকে। এসব ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে ওয়াসার সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে।

আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের অভিযোগ : কর্মচারীদের অভিযোগ, মিরপুর ৬০ ফিট এলাকায় জোনায়েতের রয়েছে আলিশান ফ্ল্যাট। এছাড়া তার ভাইকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর ব্যয়ও বহন করছেন তিনি।

তার চাকরির বেতন-ভাতার সঙ্গে এই জীবনযাত্রার কোনো সামঞ্জস্য নেই বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কোন উৎস থেকে আসছে এই বিপুল অর্থ ?

নিয়ম ভেঙে পদোন্নতি, আতঙ্কে কর্মচারীরা : ওয়াসার অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই কয়েকজন কম্পিউটার অপারেটরকে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

এতে চাকরির নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সাধারণ কর্মচারীরা। তাদের ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর তারা আশা করেছিলেন নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা ফিরবে। কিন্তু প্রশাসনে জোনায়েতের মতো “দালালচক্র” সক্রিয় থাকলে সেই আশার বাস্তবায়ন অসম্ভব।

“কর্তৃপক্ষ আর কতদিন নীরব থাকবে ?” প্রশাসনিক তত্ত্বাবধায়করা বলছেন, প্রশাসন-২ এ চলমান অনিয়ম ও দুর্নীতি শুধু অফিসের পরিবেশই নষ্ট করছে না, বরং পুরো ওয়াসার প্রশাসনিক কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

একজন কম্পিউটার অপারেটর কীভাবে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব খাটিয়ে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন—তা নিয়েও উঠেছে বড় প্রশ্ন।

এখন প্রশ্ন একটাই—দুর্নীতি, প্রভাববাণিজ্য ও সিন্ডিকেটনির্ভর এই প্রশাসনের বিরুদ্ধে কি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেবে কর্তৃপক্ষ? নাকি ওয়াসায় ‘হিরক রাজার দেশ’ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে?

👁️ 65 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *