
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা সংস্থাটির বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সুলতান আহমেদ খান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, টেন্ডার সিন্ডিকেট, বদলি বাণিজ্য ও প্রকল্প লুটপাটের মাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএকে কার্যত ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড সংশ্লিষ্ট একটি মামলায় রাজধানীর ভাটারা থানায় নাম থাকার পরও রহস্যজনক কারণে এখনো গ্রেফতার এড়িয়ে চলছেন এই কর্মকর্তা।

অভিযোগ রয়েছে, মামলা থেকে রেহাই পেতে প্রায় ৫ কোটি টাকার “ম্যানেজমেন্ট ফান্ড” গঠন করে বিভিন্ন মহলে তদবির ও প্রভাব বিস্তারের মিশনে নেমেছেন তিনি। একইসঙ্গে নিজেকে “সৎ, দক্ষ ও বিএনপি-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা” হিসেবে পরিচয় দিয়ে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

“হানিফের ভাগ্নে” পরিচয়ে একক আধিপত্য : বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিগত ১৫ বছর ধরে সাবেক আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ–এর ভাগ্নে পরিচয় ব্যবহার করে সংস্থাটিতে অপ্রতিরোধ্য প্রভাব বিস্তার করেন সুলতান আহমেদ খান। বদলি, পদায়ন, নিয়োগ, টেন্ডার অনুমোদন, ড্রেজিং প্রকল্প—সবকিছুই তার ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার অনুমতি ছাড়া সংস্থাটিতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে বিআইডব্লিউটিএতে গড়ে ওঠে এক ভয়ঙ্কর “সুলতান সিন্ডিকেট”, যেখানে যোগ্যতা নয়—রাজনৈতিক আনুগত্য ও অর্থ লেনদেনই ছিল পদোন্নতি ও সুবিধা পাওয়ার প্রধান মাধ্যম।
সৎ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, দুর্নীতিবাজদের ছত্রচ্ছায়া : অভিযোগ রয়েছে, সুলতান খানের ঘনিষ্ঠ শ্রমিক লীগ নেতা সনজিব কুমার দাসকে ব্যবহার করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হতো। বেনামি অভিযোগপত্র, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং প্রশাসনিক হয়রানির মাধ্যমে বহু কর্মকর্তাকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল দীর্ঘদিন।
এমনকি গত বছরের ২ অক্টোবর তাকে বিআইডব্লিউটিএ থেকে সরিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে পাঠানো হলেও তার নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংস্থার ভেতরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, বিভাজন তৈরি এবং সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতেই এই চক্র নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শ্রমিক দলের নেতার ওপর হামলার অভিযোগ : সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএতে শ্রমিক দলের সভাপতি মাজহারুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনায়ও সুলতান খানের অনুসারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পতিত আওয়ামী বলয়ের সুবিধাভোগী অংশ এখনো সংগঠিত হয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
১২০০ কোটি টাকার ড্রেজিং প্রকল্পে ‘মহালুট’ : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। পাবনা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ড্রেজিং প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় ১২০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সুলতান আহমেদ খানের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, নদী খননের বিপুল পরিমাণ মাটি বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও সেই অর্থ ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের বিভিন্ন দরপত্রে পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগ, কমিশন বাণিজ্য এবং কাজের গুণগত মানে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ভুয়া সনদে পদোন্নতির অভিযোগ : সুলতান আহমেদ খানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ—ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হয়েও ভুয়া সনদ ব্যবহার করে পদোন্নতি নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদ বাগিয়ে নেন তিনি। এমনকি ১৯৯৬ সালে তার চাকরিতে প্রবেশও ছিল রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের মাধ্যমে—এমন অভিযোগও সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে।
“আওয়ামী লীগ ২০৪১ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে” : বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–ঘনিষ্ঠ মহলের আশীর্বাদে দীর্ঘদিন ধরেই বেপরোয়া আচরণ করতেন সুলতান আহমেদ খান। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিভিন্ন সময় তিনি প্রকাশ্যে বলতেন—“আওয়ামী লীগ ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে, আমাকে কেউ ছুঁতে পারবে না।”
এই দম্ভের জোরেই তিনি বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাবনা জেলার শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে রাজধানীর উত্তরায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন তিনি বলে জানা গেছে।
তদন্তে দুদক, ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা : বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা জানিয়েছেন, সুলতান আহমেদ খান কেন ? বিআইডব্লিউটিএ’র যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠবে সেসকল অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের একটি টিম তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এখনো বিভিন্ন দফতরে বেনামি চিঠি পাঠিয়ে সৎ কর্মকর্তাদের সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
নৌখাত সংস্কারে বড় বাধা ‘পুরনো সিন্ডিকেট’ : গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে পতিত আওয়ামী সরকারের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নৌখাত সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ভেস্তে দিতেই পুরনো দুর্নীতিবাজ চক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নৌখাত বিশেষজ্ঞদের মতে, বিআইডব্লিউটিএতে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্রভাব, টেন্ডার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা না গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।
রাষ্ট্রীয় অর্থ লুট, প্রশাসনিক সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
