
নিজস্ব প্রতিবেদক : সমবায় সমিতির নিবন্ধন, তদারকি, আইনগত সহায়তা এবং তৃণমূল পর্যায়ে সমবায়ভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা সমবায় অধিদপ্তরের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে—যা নিয়ে দপ্তরের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

অভিযোগগুলোর কেন্দ্রে রয়েছেন সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক (প্রশাসন, মাসউ ও ফাইন্যান্স) মো. নবীরুল ইসলাম। বিভিন্ন সূত্র ও অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে দপ্তরের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ করা হয়েছে।
চাকরি ও নিয়োগ ঘিরে অভিযোগ : অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, নবীরুল ইসলাম ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। তবে তার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, কোটা ব্যবহার এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগও বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপিত হয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে প্রবেশের সময় মুক্তিযোদ্ধা কোটাসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয় এবং বিষয়টি নিয়ে অতীতে আইনগত প্রক্রিয়া চলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো রায় বা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির তথ্য প্রতিবেদকের হাতে নেই।

মামলা, দুদক তদন্ত ও সাময়িক বরখাস্তের দাবি : একাধিক সূত্র দাবি করেছে, ২০০১ সালে একটি মামলার প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তে নামলে পরবর্তীতে ২০০২ সালে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে প্রভাব খাটিয়ে তিনি পুনরায় কর্মস্থলে ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক নথি বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী পর্যায়ের অভিযোগ : অভিযোগে বলা হয়, সিরাজগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে একটি সমবায় ব্যাংকের জমি বিক্রয়সংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। একইভাবে রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে বন্ধকী জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং প্রশাসনিক অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করে, এসব ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত হলেও তা কার্যকরভাবে এগোয়নি।

‘সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের’ অভিযোগ : অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নবীরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যারা বদলি, পদোন্নতি, লাইসেন্স অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করত বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এই সিন্ডিকেটে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নামও উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো বিচারিক রায় বা চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদকের কাছে পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ : প্রতিবেদনে আরও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আলাদা অভিযোগ উঠে এসেছে— সমিতি নিবন্ধন ও তদারকিতে ঘুষ বাণিজ্য ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, অডিট কার্যক্রমে সরেজমিন যাচাই ছাড়া টেবিল অডিট ও ভুয়া প্রতিবেদন প্রদানের অভিযোগ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সমিতি থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ, বদলি ও পোস্টিংকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ, এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অস্বীকার করেছেন বা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও মামলা : কিছু সমবায় সমিতির সদস্য ও ভুক্তভোগী পক্ষ থেকে থানায় মামলা ও দুদকে অভিযোগ দায়েরের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দাবি, প্রশাসনিক চাপ ও প্রভাবের কারণে অনেক তদন্ত দীর্ঘায়িত বা স্থগিত হয়ে যায়।
হুমকির অভিযোগ : প্রতিবেদকের কাছে বক্তব্য জানতে চাইলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার পক্ষ থেকে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং পরে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির পক্ষ থেকে হুমকি প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। তবে এ বিষয়ে স্বাধীন যাচাই বা আইনগত প্রমাণ প্রতিবেদকের কাছে নেই।
প্রশাসনের অবস্থান ও তদন্তের দাবি : সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরের অভ্যন্তরে কিছু অনিয়ম ও প্রভাবশালী চক্রের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
তারা বলেন, “এসব অভিযোগের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং দপ্তরের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।”
উপসংহার : সমবায় অধিদপ্তর ঘিরে উত্থাপিত এসব অভিযোগ গুরুতর ও ব্যাপক হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা অভিযোগ পর্যায়ের তথ্য, যা স্বাধীন তদন্ত বা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত নয়। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক পদক্ষেপই এসব বিতর্কের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
