
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শাখার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর-ই খোদার বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, প্ল্যান অনুমোদনে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এও লিখিত আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘ চাকরি জীবনে নূর-ই খোদা বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, যার উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তা অস্বীকার করেছেন।
দরিদ্র পরিবার থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ : জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার গঙ্গাপাড়া গ্রামের একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা নূর-ই খোদা ২০০৪ সালের ৩ নভেম্বর সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে রাজউকে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, দুই দশকের বেশি সময়ের চাকরি জীবনে তিনি বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নিজ এলাকায় একাধিক ভবন, রাইস মিল, জমি ও অন্যান্য সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। এছাড়া রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় রয়েছে ফ্ল্যাট, প্লট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি।

প্ল্যান অনুমোদন ঘিরে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ : রাজউকের প্ল্যান অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নূর-ই খোদার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, ভবনের আকার ও তলার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে প্ল্যান অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ লেনদেনের একটি অনৈতিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ছোট ভবনের ক্ষেত্রে কয়েক লাখ টাকা থেকে শুরু করে বড় ভবনের নকশা অনুমোদনে কয়েক দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। বিশেষ করে আবাসন
কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন প্রকল্পের ছাড়পত্র ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাউজিং কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের নকশা অনুমোদন ও ছাড়পত্র প্রক্রিয়ায় নূর-ই খোদার প্রভাব রয়েছে।
রাজউকের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফাইল আটকে রেখে অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা এবং পরে দর-কষাকষির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা আদালতে প্রমাণিত তথ্য পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সম্পদের পাহাড়ের অভিযোগ : অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নূর-ই খোদার রাজধানীর উত্তরা এলাকায় একটি বহুতল ভবন রয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েক দশ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া সাভার-আশুলিয়া এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি, একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও অন্যান্য সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্ত্রী-সন্তানের নামেও বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকে অভিযোগ : গত ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে ধানমন্ডি-হাজারীবাগ এলাকার বাসিন্দা জাবেদ শেখ দুর্নীতি দমন কমিশনে নূর-ই খোদার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধান, দায়িত্ব পালনে অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
চেয়ারম্যানের ‘আশীর্বাদের’ অভিযোগ : অভিযোগকারীদের দাবি, রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম রিজুর সময়ে নূর-ই খোদা প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। তবে চেয়ারম্যান বা রাজউক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘খলিফা’ পরিচিতির অভিযোগ : রাজউকের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, নূর-ই খোদাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কার্যকর তদন্তের মুখোমুখি হয়নি।
এক কর্মকর্তা বলেন, “কিছু কর্মকর্তার অনিয়মের কারণে পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
অভিযোগ অস্বীকার নূর-ই খোদার : অভিযোগের বিষয়ে জানতে মোহাম্মদ নূর-ই খোদার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমার সম্পদ থাকলে তা আপনি নিয়ে নেন। হাউজিং কোম্পানির সঙ্গে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।” তিনি আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
তদন্তে বেরিয়ে আসবে প্রকৃত চিত্র : দুদকে দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরু হলে নূর-ই খোদার সম্পদের প্রকৃত উৎস, প্ল্যান অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং অভিযোগের পেছনে সত্যতা কতটুকু—তা স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। (চলবে…)
