
নিজস্ব প্রতিনিধি (সাতক্ষীরা) : মাসিক বেতনে সরকারি চাকরি করলেও সম্পদের বহরে যেন শিল্পপতিকেও ছাড়িয়ে গেছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাবেক তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে।

অবসরের পর তাঁর বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে সাতক্ষীরাজুড়ে চলছে নানা আলোচনা। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিজীবনে ক্ষমতার প্রভাব ও অনিয়মের মাধ্যমে স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের নামে-বেনামে শত শত বিঘা কৃষিজমি, বহুতল ভবন, মার্কেট, মূল্যবান প্লটসহ প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি।
এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) খুলনা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আব্দুল মালেক সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মটিয়াডাঙ্গা গ্রামের মৃত আরিফ সরদারের ছেলে। ১৯৯২ সালে বয়সের শেষ সময়ে বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এলডি-কাম-টাইপিস্ট পদে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। যশোর অফিসে যোগদানের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর সরকারি চাকরিজীবন।

স্থানীয় সূত্র ও তাঁর কয়েকজন নিকটাত্মীয়ের দাবি, চাকরিতে যোগদানের কয়েক বছর পর অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে তাঁকে যশোর থেকে মাদারীপুরে বদলি করা হয়। পরে সেখানেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় ঢাকায় বদলি করা হয় বলে দাবি করেন তারা। বিভিন্ন স্থানে বদলি হলেও তাঁর সম্পদের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জমি, ভবন ও মার্কেটে বিপুল বিনিয়োগের অভিযোগ :
অভিযোগকারীদের দাবি, সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কচুয়া, কাদাকাটি এবং তালা উপজেলার মুড়াগাছা বিল এলাকায় স্ত্রী শরিফুর নেছা খুকু, ছেলে মুজাহিদুল ও শ্যালক সালাউদ্দীনের নামে প্রায় দেড় থেকে দুইশ বিঘা কৃষিজমি রয়েছে। এছাড়া বুধহাটা বাজার মার্কেটে তাঁর পরিবারের নামে একাধিক দোকান কেনার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের বিয়েতে রাজধানীর বনানীতে একটি ফ্ল্যাট এবং একটি দামি গাড়ি উপহার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাতক্ষীরা শহরের কামানগর এলাকায় তাঁর একটি পাঁচতলা ভবন ও মার্কেট রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজারবাগ, যশোর এবং সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তাঁর নামে-বেনামে আরও একাধিক প্লট ও জমি রয়েছে। অনুসন্ধানে খড়িয়াডাঙ্গা, গোপালডাঙ্গা, সুখদেবপুর ও নেহালপুর এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ বিঘা জমি এবং ব্রহ্মরাজপুর বাজারে একটি দ্বিতল ভবন ও মার্কেট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন। সব মিলিয়ে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা হতে পারে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে প্রশ্ন : স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৩ সালে অবসরের পর খুলনা দুদকের একটি দল আব্দুল মালেকের সম্পদের অনুসন্ধানে আসে। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় তিনি শহর ও শ্বশুরবাড়ি এলাকার সম্পদের তথ্য গোপন করে গ্রামের পুরোনো বাড়ির তথ্য দেখান।
এছাড়া স্থানীয় একটি জামে মসজিদের নামে দান করা ১০ বিঘা জমি দীর্ঘদিন নিজের দখলে রাখার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পরে গ্রামবাসীর চাপের মুখে ওই জমির বিপরীতে মসজিদকে অর্থ প্রদান শুরু করেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
অভিযোগ অস্বীকার মালেকের : তবে আব্দুল মালেক তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমার পৈতৃক সূত্রে ৩২ বিঘা জমি রয়েছে এবং আমার স্ত্রী তাঁর বাবার বাড়ি থেকে ২৮ বিঘা জমি পেয়েছেন। এর বাইরে কোনো অবৈধ সম্পদ নেই।”
স্ত্রী, ছেলে ও শ্যালকের নামে কৃষিজমি, বুধহাটা বাজারে দোকান, মেয়ের নামে রাজধানীতে ফ্ল্যাট ও দামি গাড়ির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য না করে বলেন, “দুদকে করা অভিযোগের ভিত্তিতে খুলনা দুদকের একটি দল সরেজমিন তদন্ত করেছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।”
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি চাকরিজীবনের আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দুদকের তদন্তই এখন সবার নজরে।
