ক্ষমতার বলয়ে প্রভাব বিস্তার, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগ; পারিবারিক বিরোধে উঠে এলো নানা বিতর্ক ! পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর সম্পাদক ও প্রকাশক সহ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলাসহ গুমরে হুমকি !


নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি প্রকল্পের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার ও অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অনুসন্ধানের আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।


অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বদরুল আলম খান নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে আসছেন। তাদের অভিযোগ, তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি নির্মাণকাজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

প্রধান প্রকৌশলীর পরিবর্তনের পর বেড়েছে প্রভাব—এমন অভিযোগ : অভিযোগে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে পরিবর্তনের পর বদরুল আলম খানের প্রশাসনিক প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বদরুল আলম খানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এবং ভোলায় কর্মরত অবস্থায় সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে নিয়োগ, বদলি ও টেন্ডার কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে তিনি নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন।

ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অভিযোগ : ঠিকাদারদের অভিযোগ, ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার কয়েকজন ঠিকাদারকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কুমিল্লার একটি দরপত্রে ভুয়া সনদধারী ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।
এছাড়া ‘আসিফ’ নামের এক ঠিকাদারকে পুলিশের বিভিন্ন থানা ভবন নির্মাণসহ একাধিক সরকারি প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য তদবিরের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মিরপুর পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্পের আরবরিকালচার কাজ বিধিবহির্ভূতভাবে অন্য বিভাগের মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ভাষানটেক থানার ভবন নির্মাণের কাজও পছন্দের ঠিকাদারকে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্পদের পাহাড়ের অভিযোগ, দুদকে অনুসন্ধানের আবেদন : দুদকে দেওয়া অভিযোগে বদরুল আলম খান, তার পরিবারের সদস্য এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল স্থাপনা, খামারবাড়ি, ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এছাড়া ভাই-বোনদের নামে সম্পদ স্থানান্তর, ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ততা এবং আয়কর নথিতে প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগও তদন্তের দাবি করা হয়েছে।

বদলি নিয়েও প্রশ্ন : অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি তাকে সাভার সার্কেল থেকে ঢাকা গণপূর্ত-১ সার্কেলে বদলি করা হয়। তবে ওই পদে অন্য কর্মকর্তার নাম সুপারিশ করা থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে নিজের পছন্দের পদায়ন নিশ্চিত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বদলির পরও তিনি অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে পারিবারিক অভিযোগ : বদরুল আলম খানের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও তার প্রথম স্ত্রী মিসেস জেসমিনের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ২৫ বছরের সংসার জীবনে স্বামী তাকে অবহেলা করেছেন এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল ছিলেন না। তাদের তিন কন্যা সন্তানের মধ্যে ছোট মেয়ে বাবার আচরণে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

জেসমিনের অভিযোগ, বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে নারীঘটিত বিতর্ক নতুন নয়। তার দাবি, এটিএন বাংলার সংবাদ পাঠিকা রোখসানা আক্তার মিমের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পর্ক থাকার পর প্রায় সাত মাস আগে তাকে বিয়ে করেছেন বদরুল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রথম স্ত্রী থাকা অবস্থায় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই দ্বিতীয় বিয়ে করা হয়েছে এবং তাকে তালাকের নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
জেসমিন দাবি করেন, বদরুল আলম খানের সম্পদের বড় অংশ ভাই-বোনদের নামে রয়েছে এবং এ বিষয়ে তার কাছে বিভিন্ন তথ্য ও নথি রয়েছে।
তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

রোখসানা মিমের বক্তব্য : অভিযোগের বিষয়ে এটিএন বাংলার সংবাদ পাঠিকা রোখসানা আক্তার মিম বলেন, তিনি ও বদরুল আলম খান সাত মাস ধরে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আছেন এবং তারা বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছেন।
তিনি দাবি করেন, বদরুল আলম খানের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে এবং শিগগিরই তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। তবে তিনি বদরুল আলম খানের সঙ্গে লিভ টুগেদারের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এটিএন বাংলার বক্তব্য : এ বিষয়ে এটিএন বাংলার ভাইস প্রেসিডেন্ট রাসেল মাহমুদ বলেন, রোখসানা আক্তার মিম নামে একজন সংবাদ পাঠিকা এটিএন বাংলায় আছেন কি না, তা তিনি নিশ্চিতভাবে জানেন না। তিনি বলেন, ডে-নাইট শিফটে অনেক সংবাদ পাঠিকা কাজ করেন, সবার বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে জানা সম্ভব নয়।
অভিযোগ প্রকাশের পর আইনি হুমকির অভিযোগ : বদরুল আলম খানকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর কয়েকটি গণমাধ্যমের সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বন্ধ করতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি : অভিযোগকারীদের দাবি, বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে সরকারি প্রকল্পের দরপত্র, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার, সম্পদ অর্জন এবং সম্ভাব্য অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
