
নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে একযোগে বিএনপির ১২ নেতাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক ১২টি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব নিয়োগের তথ্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনসহ প্রশাসনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা অনেকেই বলছেন নতুন মোড়কে সেই পুরনো সিস্টেম।

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
কিন্তু একই রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা ও করপোরেশনের নেতৃত্বে বসানোর ঘটনায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার উপসচিব মো. গোলাম রব্বানী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদ ছাড়া বাকি ১১টি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে গ্রেড-২ পদমর্যাদায়। এসব নিয়োগ কার্যকর হবে যোগদানের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য।

গুরুত্বপূর্ণ ১২ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিরা
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছেন সামসুল আলম। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হয়েছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি সালাহ্উদ্দিন সরকার। বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হক। বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এটিএম আবদুল বারী ড্যানী। বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব হয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি (দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. কামরুজ্জামান (কামরুজ্জামান দুলাল)। একই পদমর্যাদায় বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান (সুরুজ)। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছেন বিএনপির সহ-বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম (টিপু)। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জাকির হোসেন (সিদ্দিকী)। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদ। বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নাকি রাজনৈতিক পুনর্বাসন ? রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর এই প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে পরিচালনা করা না গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, নিয়োগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নীতিনির্ধারণে পক্ষপাতের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, নৌপরিবহন, শিল্প, বন, সমাজকল্যাণ ও শ্রম খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও জনআস্থার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসার অভিযোগের মুখে পড়েছে। ফলে নতুন করে কোনো দলের নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে ব্যাপকভাবে নিয়োগ দেওয়া হলে ‘দলীয়করণের ধারাবাহিকতা’ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
দক্ষতা বনাম আনুগত্যের বিতর্ক : সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এসব পদে কি পেশাগত দক্ষতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা প্রধান বিবেচনা ছিল, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্য ?
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্তরা অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তা ছিন্ন করার শর্তে দায়িত্ব পালন করবেন।
এখন দেখার বিষয়, এসব নিয়োগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ায় নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে—সেটিই পর্যবেক্ষণের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
