
নিজস্ব প্রতিবেদক : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত গোপন চেম্বারযুক্ত জ্যাকেট ব্যবহার করে ফেন্সিডিল পাচারের অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছিল একটি সংঘবদ্ধ মাদক চক্র। তবে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা নজরদারি ও পরিকল্পিত অভিযানের মাধ্যমে সেই কৌশল ভণ্ডুল করে দিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। রাজধানীর মহাখালী এলাকায় পরিচালিত বিশেষ অভিযানে চক্রটির চার সদস্যকে গ্রেফতার এবং ৩০৯ বোতল কোডিন ফসফেটযুক্ত ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়েছে।

ডিএনসি জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই অবৈধ মাদকের বিরুদ্ধে পেশাদারিত্ব, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছে সংস্থাটি। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অভিযান এবং আইন প্রয়োগমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার এবং বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার সম্ভব হচ্ছে।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে, কয়েকজন মাদক কারবারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ন্যাশনাল ট্রাভেলস ও দেশ ট্রাভেলসের দুটি যাত্রীবাহী বাসে বিপুল পরিমাণ কোডিন ফসফেটযুক্ত ফেন্সিডিল ঢাকায় নিয়ে আসছে।

এ তথ্যের ভিত্তিতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের একটি বিশেষ টিম রাজধানীর বনানী থানাধীন মহাখালী কাঁচাবাজার এলাকায় কস্তুরী রেস্টুরেন্টের সামনে অবস্থান নেয়।

নির্ধারিত সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী ন্যাশনাল ট্রাভেলস (রেজি. নং: ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৯৯১০) সেখানে পৌঁছালে বাসটি থামিয়ে বি-৩, সি-৩ ও সি-৪ নম্বর আসনে বসা তিনজন সন্দেহভাজন যাত্রীকে আটক করা হয়। পরে তাদের বহন করা দুটি ট্রাভেলস ব্যাগ তল্লাশি করে ২০৯ বোতল ভারতীয় কোডিন ফসফেটযুক্ত ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়।
এর কিছুক্ষণ পর দেশ ট্রাভেলস (রেজি. নং: ঢাকা মেট্রো-ব-১২-৩৭৯৯) একই স্থানে পৌঁছালে জি-১ নম্বর আসনে বসা এক যাত্রীকে আটক করা হয়। তার দেহে পরিহিত বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত একটি জ্যাকেটের গোপন চেম্বার তল্লাশি করে ৫০ বোতল কোডিন ফসফেটযুক্ত ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে অপর একটি বিশেষ জ্যাকেটের গোপন চেম্বার থেকেও আরও ৫০ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন— মো. নাসিরুল ইসলাম (৪৮), চাঁপাইনবাবগঞ্জ; মো. ফাহিম আজাদ (২৭), লালপুর, নাটোর; মোছা. জুলেখা খাতুন (৩২), শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং মোছা. শারমিন খাতুন (৩২), চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
অভিযানে উদ্ধার হওয়া আলামতের মধ্যে রয়েছে দুটি ট্রাভেলস ব্যাগ থেকে ২০৯ বোতল এবং দুটি বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত জ্যাকেটের গোপন চেম্বার থেকে ১০০ বোতলসহ মোট ৩০৯ বোতল কোডিন ফসফেটযুক্ত ফেন্সিডিল। প্রতিটি বোতলে ১০০ মিলিলিটার হিসেবে মোট ৩০ দশমিক ৯ লিটার তরল মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া মাদক ব্যবসায় ব্যবহৃত ৮টি মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে ডিএনসি জানতে পেরেছে, এই সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটটি গত ৩ থেকে ৪ বছর ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নিয়মিত ঢাকায় ফেন্সিডিল সরবরাহ করে আসছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে তারা মাদক পরিবহনের সময় ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ রাখত, একাধিক রুট ও একাধিক যাত্রীবাহী বাস ব্যবহার করত এবং নিজেদের যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের জন্য বিভিন্ন ধরনের এনক্রিপ্টেড অ্যাপস ব্যবহার করত।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, মাদক পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত বিশেষ জ্যাকেটগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে শরীরের সঙ্গে সহজে বহন করা যায় এবং বাইরে থেকে সাধারণ পোশাক বলেই মনে হয়। প্রতিটি জ্যাকেটের ভেতরে একাধিক গোপন চেম্বার ছিল, যেখানে একসঙ্গে ৫০ থেকে ৬০ বোতল পর্যন্ত ফেন্সিডিল বহন করা সম্ভব। ডিএনসির ভাষ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ফাঁকি দিতেই এই অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছিল চক্রটি।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের যোগসাজশে সংঘবদ্ধভাবে ESKUF Syrup ও FAIRDYL Syrup নামে পরিচিত কোডিন ফসফেটযুক্ত ফেন্সিডিলের অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসব নিষিদ্ধ মাদক সংগ্রহ করে বিভিন্ন যাত্রীবাহী বাসে ঢাকায় এনে স্থানীয় মাদক কারবারিদের কাছে সরবরাহ করত।
ডিএনসি জানিয়েছে, তদন্তে আরও জানা গেছে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে পূর্বেও একাধিক মাদক মামলা রয়েছে এবং পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি সুসংগঠিত মাদক পাচার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে আসছিল।
এ ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় বনানী থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ডিএনসি জানিয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সদস্য, অর্থদাতা, সরবরাহকারী ও সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, ফেন্সিডিলসহ সব ধরনের নিষিদ্ধ মাদকের বিস্তার রোধে রাজধানীসহ সারাদেশে গোয়েন্দা নজরদারি, বিশেষ অভিযান এবং আইন প্রয়োগমূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও আরও জোরদারভাবে পরিচালিত হবে।
