পঞ্চগড়ের শালবাহান তেলকূপ : এক সপ্তাহেই বন্ধ, ৩৮ বছরেও মেলেনি জবাব  :  ‘তেল নেই’ বলেই কি শেষ হয়েছিল অনুসন্ধান ? আধুনিক প্রযুক্তিতে পুনরায় জরিপের দাবি !  

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত গ্রাম বাংলার খবর জাতীয় প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ সিলেট

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যখন আমদানিনির্ভরতার চাপে বারবার প্রশ্নের মুখে, তখন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার শালবাহান তেলকূপের পুরোনো কাহিনি নতুন করে সামনে এসেছে। কয়েক দশক আগে বিপুল সম্ভাবনার কথা বলে যে এলাকায় অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, সেটি উদ্বোধনের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কূপটি সিল করে দেওয়া হয়। কেটে গেছে প্রায় চার দশক—কিন্তু কেন বন্ধ হলো, কী পাওয়া গিয়েছিল, কতটুকু উৎপাদন সম্ভব ছিল এবং বন্ধের সিদ্ধান্তের পেছনে কারিগরি প্রতিবেদন কী বলেছিল—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর আজও জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়।


বিজ্ঞাপন

২০২৬ সালে স্থানীয়দের নতুন করে আন্দোলনের পর প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে: শালবাহানে সত্যিই বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য তেল ছিল না, নাকি একটি অসম্পূর্ণ অনুসন্ধানের ফলাফলকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল?
শুরুটা ছিল আশাব্যঞ্জক

তেঁতুলিয়ার শালবাহান-জুগিগছ এলাকায় ১৯৮০-এর দশকে ভূকম্পন জরিপের মাধ্যমে হাইড্রোকার্বনের সম্ভাবনার কথা উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে সেখানে অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন সরকারের আমলে প্রকল্পটিতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।


বিজ্ঞাপন

১৯৮৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ শালবাহানে খনন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ফরাসি একটি কোম্পানিকে অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল গভীর কূপের মাধ্যমে সম্ভাব্য তেল উত্তোলন। অর্থাৎ বিষয়টি কোনো স্থানীয় গুজবের ভিত্তিতে শুরু হয়নি; রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, অনুসন্ধান, প্রকল্প ব্যয় এবং বিদেশি প্রযুক্তিগত সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়েই শালবাহানকে ঘিরে সম্ভাবনার যাত্রা শুরু হয়েছিল। তারপরই যেন হঠাৎ ‘ব্রেক’ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই।


বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের দাবি এবং একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল উত্তোলনের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর পর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানিও তাদের যন্ত্রপাতি গুটিয়ে নেয়। পরে কূপটি স্থায়ীভাবে সিল করে দেওয়া হয়।

এখানেই তৈরি হয় রহস্যের মূল জায়গা  :  একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অনুসন্ধান প্রকল্প—যার পেছনে সরকারি অর্থ, বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং বড় ধরনের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ছিল—সেটি যদি সত্যিই বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ কারিগরি প্রতিবেদন কোথায়  ? কী পরিমাণ তেল পাওয়া গিয়েছিল ? কী ধরনের তেল বা হাইড্রোকার্বন পাওয়া গিয়েছিল ? ফ্লো টেস্টের ফলাফল কী ছিল ? উৎপাদনের সম্ভাব্য হার কত ছিল? কেন কূপটিকে ‘ড্রাই’ বা অকার্যকর ঘোষণা করা হলো ? এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে পরিষ্কারভাবে না এলে সন্দেহ থেকেই যায়। ‘তেল নেই’—নাকি ‘বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়’?

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই।
কারণ ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে মাটির নিচে হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য তেলক্ষেত্র—দুটি এক জিনিস নয়।

সাম্প্রতিক কিছু ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণেও উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের পুরোনো অনুসন্ধান কূপগুলোতে হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতির ইঙ্গিত থাকলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনের প্রমাণ না থাকার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ ‘তেল বা হাইড্রোকার্বনের চিহ্ন পাওয়া’কে সরাসরি ‘বাণিজ্যিক তেলক্ষেত্র আবিষ্কার’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—
১৯৮০-এর দশকের প্রযুক্তি ও তথ্য দিয়ে করা সিদ্ধান্ত কি ২০২৬ সালের প্রযুক্তি দিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে ? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে প্রায় চার দশক ধরে একটি সম্ভাবনাময় ভূগর্ভস্থ কাঠামোকে নতুন করে পরীক্ষা না করেই পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখা হয়েছে কি না—সেটিই এখন তদন্তের বিষয়।

‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’—প্রমাণ কোথায় ? শালবাহান বন্ধের সঙ্গে ভারতীয় স্বার্থ বা আন্তর্জাতিক চাপের সম্পর্ক রয়েছে—এমন দাবি বহু বছর ধরে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচলিত। এমনকি স্থানীয় আন্দোলনকারীরাও এ ধরনের সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আবার কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই বিদেশি কোম্পানি পরবর্তী সময়ে ভারতের জলপাইগুড়ি এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়েছিল—এ বিষয়টিও স্থানীয় সন্দেহকে উসকে দিয়েছে। কিন্তু এখানে সাংবাদিকতার সবচেয়ে জরুরি সতর্কতা হলো—এসব দাবি এখনো প্রমাণিত সত্য নয়।

 

ভারত বাংলাদেশের ভূগর্ভ থেকে শালবাহানের তেল তুলে নিচ্ছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য বৈজ্ঞানিক বা সরকারি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকে সত্য হিসেবে প্রচার না করে বরং প্রশ্ন হিসেবে তদন্ত করা প্রয়োজন । কোন কোম্পানি কখন কোথায় কূপ খনন করেছে ? সেই কূপের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান কী  ? দুই দেশের ভূগর্ভস্থ কাঠামোর মধ্যে কোনো সংযোগ আছে কি না? সেই সময়ের বাংলাদেশি ও বিদেশি অনুসন্ধান প্রতিবেদনগুলোতে কী বলা হয়েছিল ? এসব তথ্য প্রকাশ পেলেই বোঝা যাবে—এটি নিছক কাকতালীয় ঘটনা, নাকি আরও গভীর কোনো বিষয়।

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা—পরবর্তী অনুসন্ধান না করা  :  শালবাহান কূপ বন্ধ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত তেল পাওয়া না-পাওয়ার চেয়েও অন্য জায়গায়। বাংলাদেশ কি এরপর কখনো আধুনিক প্রযুক্তিতে ওই এলাকার পূর্ণাঙ্গ পুনঃমূল্যায়ন করেছে?

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দীর্ঘদিন পরও স্থানীয়রা নতুন করে জরিপ ও অনুসন্ধানের দাবি জানিয়ে আসছেন। ২০২৬ সালে তেঁতুলিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর কথা জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ ৩৮ বছর পরও বিষয়টি আবার ‘সম্ভাব্যতা যাচাই’-এর পর্যায়ে আলোচনায় আসছে। এটাই কি সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক প্রশ্ন নয় ?

৩৫ কোটি টাকা—তারপরও জবাবদিহি কোথায় ? পুরোনো সংবাদভিত্তিক তথ্যে শালবাহান প্রকল্পের জন্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ আছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হলো। জমি অধিগ্রহণ হলো। বিদেশি বিশেষজ্ঞ এলেন। কূপ খনন হলো। উদ্বোধন হলো। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম হলো।

তারপর সব বন্ধ   :  যদি প্রকল্পটি প্রযুক্তিগতভাবে ব্যর্থ হয়ে থাকে—ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট কোথায় ? যদি তেল উত্তোলন অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক হয়ে থাকে—কোন অর্থনৈতিক সমীক্ষার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ? যদি কূপে পর্যাপ্ত চাপ বা প্রবাহ না থাকে—ফ্লো টেস্টের তথ্য কোথায় ? যদি কূপটি সত্যিই ‘ড্রাই’ হয়ে থাকে—পরবর্তী সময়ে নতুন প্রযুক্তিতে পুনরায় পরীক্ষা কেন করা হলো না ? একটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ অনুসন্ধান প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।

এখন প্রয়োজন আবেগ নয়, বৈজ্ঞানিক তদন্ত  :  শালবাহানকে ঘিরে সবচেয়ে বিপজ্জনক দুটি চরম অবস্থান হলো—একদিকে ‘এখানে বিশাল তেলের মজুত আছে’ বলে প্রমাণ ছাড়া দাবি করা, অন্যদিকে কয়েক দশক আগের একটি সিদ্ধান্তের ওপর ভর করে ‘এখানে কিছুই নেই’ বলে ধরে নেওয়া। দুটিই বৈজ্ঞানিকভাবে দুর্বল অবস্থান।

প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও আধুনিক পুনঃঅনুসন্ধান  :  সেখানে থাকতে পারে— আধুনিক 2D/3D সিসমিক জরিপ; পুরোনো কূপের লগ ও নমুনার পুনর্মূল্যায়ন; ভূতাত্ত্বিক ও ভূ-রাসায়নিক বিশ্লেষণ; নতুন করে কূপ খননের সম্ভাব্যতা যাচাই; আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের স্বাধীন মতামত; পুরোনো প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি নথি প্রকাশ; তৎকালীন বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ।

‘ষড়যন্ত্র’ প্রমাণ করতে হলে নথি চাই  :  শালবাহান নিয়ে মানুষের সন্দেহকে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আবার সন্দেহকে প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করারও সুযোগ নেই।
যদি কোনো রাজনৈতিক চাপ থেকে থাকে—নথি বের হোক।
যদি কোনো বিদেশি চাপ থেকে থাকে—তদন্ত হোক।
যদি প্রকল্পটি সত্যিই অলাভজনক হয়ে থাকে—কারিগরি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হোক। আর যদি পুরোনো সিদ্ধান্ত ভুল হয়ে থাকে—তাহলে নতুন প্রযুক্তিতে তা সংশোধন করা হোক।

৩৮ বছর ধরে একটি কূপ সিল করে রেখে ‘রহস্য’কে উত্তরাধিকার বানিয়ে রাখার কোনো যুক্তি নেই। পঞ্চগড়ের মাটির নিচে শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক তেল আছে কি নেই—সেটি হয়তো বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানই নির্ধারণ করবে। কিন্তু একটি বিষয় ইতোমধ্যে পরিষ্কার: শালবাহান কূপ বন্ধের ইতিহাসে প্রশ্নের চেয়ে উত্তর কম। এখন সেই উত্তর বের করার দায়িত্ব সরকারের। কারণ এটি শুধু পঞ্চগড়ের মানুষের আবেগের বিষয় নয়—এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জনগণের অর্থের জবাবদিহির প্রশ্ন।

তাই দাবি একটাই—পুরোনো ফাইল খুলুন, গোপনীয়তার দেয়াল সরান, আধুনিক প্রযুক্তিতে শালবাহান পুনরায় পরীক্ষা করুন।
তেল থাকলে দেশের সম্পদ দেশের কাজে লাগুক। তেল না থাকলে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা করা হোক।

আর যদি সত্যিই কোনো অনিয়ম, চাপ বা গোপন সিদ্ধান্তের কারণে জাতীয় সম্পদের অনুসন্ধান থেমে গিয়ে থাকে—তাহলে দায়ীদেরও চিহ্নিত করতে হবে। কারণ মাটির নিচে তেল আছে কি না, সেটি আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—৩৮ বছর ধরে সত্যটা খোঁজা হলো না কেন?

👁️ 41 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *