নগর পার্কে বন্দুক তাক করে আতঙ্ক, ৩৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে তোলপাড় ! ‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশায় এমন কাণ্ড! তদন্তে মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য !

Uncategorized অপরাধ আইন ও আদালত ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

বন্দুক হাতে দুই তরুণের মহড়া, এ যেনো স্বাধীন দেশের পরাধীন আইনি এখতিয়ার।


বিজ্ঞাপন

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি  : নগর পার্কে হঠাৎ দুই তরুণের হাতে বড় আকৃতির বন্দুক। পরনে আফগানিস্তানের মানুষের পোশাকের আদলে লম্বা কুর্তি-পায়জামা, মাথায় টুপি। পার্কে ঢুকেই সামনে যাকে পাচ্ছেন, তার দিকেই তাক করছেন বন্দুক। রিকশাচালক, পথচারী, এমনকি শিশুও বাদ যাচ্ছে না।

অস্ত্র তাক করা মাত্রই কারও চোখেমুখে আতঙ্ক, কেউ থমকে দাঁড়াচ্ছেন, আবার কেউ দ্রুত সরে যাচ্ছেন নিরাপদ দূরত্বে। আর মানুষের সেই ভয়, বিস্ময় ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার দৃশ্য ধারণ করছেন পেছনে থাকা এক ক্যামেরাম্যান।


বিজ্ঞাপন

মাত্র ৩৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও। অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে নারায়ণগঞ্জজুড়ে।


বিজ্ঞাপন

ভিডিওটি দেখে অনেকেরই প্রথম ধারণা হয়—প্রকাশ্য স্থানে অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দুই তরুণ এবং সাধারণ মানুষকে অস্ত্র তাক করে ভয় দেখাচ্ছেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। কেউ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেন, কেউ প্রশ্ন তোলেন প্রকাশ্যে এভাবে অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা ও নিরাপত্তা নিয়ে। তবে ঘটনার নেপথ্যে অনুসন্ধান করে পাওয়া গেছে ভিন্ন তথ্য।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভিডিওতে ব্যবহৃত বন্দুক বাস্তব নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছিল। আর সাধারণ মানুষের ভয় ও বিস্ময়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াই ছিল ভিডিওটির মূল ‘কনটেন্ট’।
প্রথমে টিকটক, পরে ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভিডিওটি প্রথমে ‘ভাইবোন’ নামের একটি টিকটক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা হয়। এরপর সেটি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে একই ভিডিও ‘লিমন সিন্স ২০০৪’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট এবং ‘ওয়াফি লিমন’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও প্রকাশ করা হয়। তিনটি অ্যাকাউন্টই নিজের বলে দাবি করেছেন লিমন তোহা। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনদের একটি বড় অংশ এর তীব্র সমালোচনা করেন।

তাদের প্রশ্ন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা কিংবা ভাইরালের জন্য সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর মতো কনটেন্ট কতটা গ্রহণযোগ্য?

কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে বন্দুক প্রদর্শনের এমন ভিডিও শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কই তৈরি করবে না, বরং বিদেশিদের কাছেও বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বা বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করতে পারে।

আবার অনেকে মনে করেন, এ ধরনের ভিডিও দেখে অন্যরাও একই কৌশলে কনটেন্ট তৈরিতে উৎসাহিত হতে পারেন। এতে সামাজিক শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কারা বানিয়েছেন ভিডিও ? অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভিডিওটি তৈরি করেছেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার বাসিন্দা লিমন তোহা ও ইয়াসিন। লিমন তোহা নারায়ণগঞ্জ শহরের দিগুবাবুর বাজার এলাকায় তার পৈতৃক দোকানে বসেন। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ধরনের ভিডিও তৈরি করেন। পরে সেসব ভিডিও টিকটক, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন। আর ইয়াসিন মূলত লিমন তোহার ভিডিও ধারণের কাজে সহযোগিতা করেন।

লিমনের পরিচালনায় ‘ভাইবোন’ অ্যাকাউন্টে তিনি ও তার বোন বিভিন্ন ধরনের ভিডিও তৈরি করে প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় নগর পার্কে বন্দুক হাতে ওই ভিডিওটি ধারণ করা হয় বলে জানা গেছে।

টিকটকের ট্রেন্ড দেখে’ এমন ভিডিও  :  লিমন তোহার দাবি, টিকটকে এ ধরনের ভিডিওর ট্রেন্ড দেখে তিনি নগর পার্কের ভিডিওটি তৈরি করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল বন্দুক দেখে সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ধারণ করা।

লিমনের ভাষ্য, ভিডিওটি মূলত ফানি ভিডিও হিসেবেই বানানো হয়েছিল। কিন্তু ফেসবুকে প্রকাশের পর অনেকে সেটিকে নেতিবাচকভাবে প্রচার করেন। তিনি বলেন, “আমরা শুধু মানুষের ভয় পাওয়ার অংশটুকু প্রকাশ করেছি। পরে তারা যে মজা করেছেন, সেই অংশটি প্রকাশ করিনি।”

লিমন জানান, তিনি পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সিনেমা ও নাটক দেখেন। সেসব নাটক ও সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের মতো করে ভিডিও তৈরি করেন। পাকিস্তানি ভিডিও ও নাটকের আদলে তৈরি কনটেন্টে তিনি বেশি সাড়া পান বলেও জানান। এরপর থেকেই এ ধরনের ভিডিও তৈরির প্রবণতা বেড়েছে বলে দাবি তার। নিজের তৈরি কনটেন্ট নিয়ে নানা সমালোচনা হলেও দেশের প্রতি তার অবস্থান স্পষ্ট বলেও দাবি করেন লিমন।

এটা অপরাধ কি না, বুঝতে পারছি না’ :  তবে প্রকাশ্যে বন্দুক দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর কর্মকাণ্ডটি সঠিক কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে লিমন তোহা বলেন, “এটা অপরাধ কি না, বুঝতে পারছি না। এটা শুধুই মজা করে তৈরি করা।” তার এই বক্তব্যের পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে—‘মজা’ করার নামে জনসমাগমস্থলে অস্ত্র সদৃশ বস্তু তাক করে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা কতটা দায়িত্বশীল আচরণ? কারণ ভিডিওটি যারা দেখেছেন, তাদের কাছে প্রথম মুহূর্তে এটি যে বাস্তব অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা বলেই মনে হয়েছে, সেটিই ভিডিওটির সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা।

পুলিশের নজরে ভাইরাল ভিডিও  :  এদিকে ভিডিওটি নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানানো হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি সাজেদুর রহমান বলেন, এমন কোনো ভিডিওর বিষয়ে তার জানা নেই। তবে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হবে। কারা ভিডিওটি তৈরি করেছে, সে বিষয়েও তথ্য নেওয়া হবে। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় পুলিশের কাছে কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ আসেনি।

ফানি ভিডিও’ নাকি জননিরাপত্তার ঝুঁকি ? নগর পার্কে ধারণ করা মাত্র ৩৫ সেকেন্ডের ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় কনটেন্ট নির্মাতারা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে পারেন?

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বন্দুকগুলো বাস্তব নয় এবং ভিডিওটি ছিল পরিকল্পিত বিনোদনমূলক কনটেন্ট। কিন্তু ভিডিওতে সাধারণ মানুষের যে আতঙ্ক ও বিস্ময় দেখা গেছে, সেটিও ছিল পরিকল্পনার অংশ।

এখন পুলিশের অনুসন্ধানে যদি ভিডিওটি তৈরির পুরো প্রেক্ষাপট, ব্যবহৃত অস্ত্র সদৃশ বস্তু এবং জনসমাগমস্থলে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বৈধতা স্পষ্ট হয়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোরও উত্তর মিলতে পারে।

ততক্ষণ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জবাসীর আলোচনায় সেই একটাই প্রশ্ন—ভাইরালের জন্য ‘মজা’ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়ানো কি নিছক বিনোদন, নাকি এরও রয়েছে সামাজিক ও আইনগত দায়?

👁️ 61 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *