জলমহালের তীরে মেঘলা

Uncategorized বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ সাহিত্য-সংস্কৃতি

জলমহালের একেবারে কিনারায় ছনের একটি নড়বড়ে ঘর। ঘর বললেও যেন ঘরটাকে পুরোপুরি ঘর বলা যায় না। কোথাও ছন উঠে গেছে, কোথাও বাঁশের বেড়া হেলে পড়েছে। বৃষ্টি হলে চাল দিয়ে পানি পড়ে। ঝড় এলে মেঘলার মনে হয়—এই বুঝি ঘরটা হাওরের পানিতে ভেসে গেল।


বিজ্ঞাপন

সেই ঘরেই বাবা আর দুই ভাইয়ের সঙ্গে থাকে মেঘলা।
বয়স তার খুব বেশি নয়। কিন্তু অভাবের সংসার তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। গ্রামের সমবয়সী মেয়েদের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে। কেউ স্বামীর বাড়িতে, কেউ সন্তান নিয়ে সংসারে ব্যস্ত।
মেঘলার বিয়ে হয়নি।

বিয়ের কথা উঠেছে কয়েকবার। কিন্তু কথা এগোয়নি।
কারণ, অভাবী ঘরের মেয়ের জন্য পাত্রপক্ষের চাহিদা মেটানো সহজ নয়। বাবা জলমহালে মাছ ধরে সংসার চালান। দুই ভাইও বাবার সঙ্গে নৌকায় যায়। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। কিন্তু মেঘলাদের সেই নড়বড়ে ঘরটা আর ঠিক হয় না।


বিজ্ঞাপন

ছয় মাস ধরে পরা জামাটাও একসময় ছিঁড়ে যায়। নতুন জামা কেনার সামর্থ্য থাকে না। মেঘলা পুরোনো কাপড় সেলাই করে আবার পরে নেয়। কোনো দিন জলমহালে মাছ ভালো পাওয়া যায়। সেদিন তাদের ঘরে একটু স্বস্তি নামে। লায় ভাত বসে, সঙ্গে মাছের ঝোল হয়। আবার কোনো দিন বাবা-ভাইরা সারাদিন নৌকা নিয়ে ঘুরেও তেমন মাছ পায় না।


বিজ্ঞাপন

সেদিন মেঘলাদের হাঁড়িতে ভাত কম পড়ে। কখনো আধপেটা খেয়ে রাত কাটে। কখনো আবার মাছ না ধরতে পারলে উপোস করেই রাত পার করতে হয়। তবু মেঘলা কাউকে কিছু বলে না। শুধু সন্ধ্যায় জলমহালের ঘাটে এসে বসে থাকে। দূরে তাকিয়ে থাকে। তার বাবা আর ভাইদের নৌকা কখন দেখা যাবে—সেই অপেক্ষায়। সেদিনও সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার। বিকেলের দিকে কালো মেঘে চারদিক ঢেকে গেল।

তারপর হঠাৎ বৃষ্টি। বৃষ্টির সঙ্গে হাওরের পানি উত্তাল হয়ে উঠল। ঢেউ একের পর এক আফাল দিয়ে তীরে আছড়ে পড়তে লাগল। ছনের ঘর কাঁপতে লাগল। মেঘলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জলমহালের দিকে তাকিয়ে রইল। বাবা আর দুই ভাই তখনও মাছ ধরতে গেছে। “এত রাত হলো… এখনো ফিরল না কেন?”

তার বুকের ভেতর অজানা ভয় জমতে লাগল। হঠাৎ— আকাশ ফেটে যাওয়ার মতো বজ্রপাত। এক মুহূর্তের জন্য পুরো হাওর সাদা আলোয় ঝলসে উঠল। মেঘলা ভয়ে ঘরের মাটিতে বসে পড়ল। তারপর আবার অন্ধকার। বৃষ্টি আরও বেড়ে গেল। রাত গভীর হলো। মেঘলার চোখ তখনও দরজার দিকে। সে জানে, একটু পর হয়তো বাবা দরজা খুলে বলবেন— “মেঘলা, ভাত দে মা… খুব ক্ষুধা লাগছে।”

কিন্তু সেই ডাক আর আসেনি। অনেক রাত পরে বাইরে মানুষের কণ্ঠ শোনা গেল। “মেঘলা… দরজা খোল।” মেঘলা ছুটে দরজা খুলল। দরজার বাইরে কয়েকজন মানুষ। তাদের কাঁধে একজন মানুষ। ভেজা কাপড়। নিস্তব্ধ শরীর। মেঘলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁপা গলায় বলল— “আব্বা…?” কেউ উত্তর দিল না। বজ্রপাতে বাবা আর ফিরতে পারেননি। যে মানুষটি প্রতিদিন মাছ নিয়ে ঘরে ফিরতেন, সেই মানুষটিই সেদিন ঘরে ফিরলেন নিথর হয়ে।
মেঘলা বাবার পাশে বসে রইল।
বাইরে তখনও বৃষ্টি। জলমহালের ঢেউ তখনও তীরে আছড়ে পড়ছে। ছনের চাল দিয়ে টুপটাপ পানি পড়ছে। আর মেঘলার চোখের পানি মিশে যাচ্ছে সেই পানির সঙ্গে। সেই রাতে মেঘলা বুঝেছিল— অভাবের সংসারে একজন মানুষ চলে গেলে শুধু একজন মানুষই হারিয়ে যায় না; একটি পরিবারের শেষ ভরসাটুকুও হারিয়ে যায়
লেখা-সম্পাদনা: হাবিব সরোয়ার আজাদ
তারিখ-বুধবার ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ See less

👁️ 19 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *