
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান : ❝নিজের বর্তমান ছবিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আশি বা নব্বইয়ের দশকের পোশাক, চুলের ধরন, আলো-ছায়া ও পুরোনো ফিল্মের আবহে রূপান্তর করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ—এখন নতুন এক নস্টালজিক ট্রেন্ড।❞

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে, বর্তমান প্রজন্মের মানুষ নিজেদের এমন এক সময়ের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করছেন, যে সময় তারা কেউ দেখেছেন, কেউবা দেখেননি। এআই কয়েক মুহূর্তেই বর্তমানের একটি ছবিকে বানিয়ে দিচ্ছে আশি বা নব্বইয়ের দশকের পুরোনো ফটোগ্রাফের মতো। পুরোনো পোশাক, চুলের স্টাইল, ফিল্মের দানাদার আবহ, সেই সময়ের রঙ ও স্টুডিও-সাজ সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে অতীতের এক কৃত্রিম পুনর্নির্মাণ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেই এই প্রবণতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিষয়টি নিছক প্রযুক্তির নতুন খেলা নয়,এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের পুরোনো একটি প্রবণতা অতীতকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

মানুষ সাধারণত তার জীবনের সুন্দর সময়গুলোকে মনে রাখে। শৈশব, কৈশোর, পরিবারের পুরোনো দিন কিংবা কোনো একটি সময়ের সামাজিক পরিবেশ তার মনে আলাদা আবেগ তৈরি করে। ফলে আশি-নব্বইয়ের নান্দনিকতা ভালো লাগা, পুরোনো দিনের ছবি দেখতে ভালো লাগা কিংবা সেই সময়ের পোশাক-পরিচ্ছদ অনুসরণ করা এসবকে শুধু সময়ের প্রতি আকর্ষণ বলেই দেখা যায়। কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য প্রশ্নটি সেখানে শেষ হয় না। প্রশ্ন হলো কীসের প্রতি এই আকর্ষণ এবং কীভাবে তা প্রকাশ করা হচ্ছে?

ইসলাম অতীতকে অস্বীকার করে না। কুরআন অতীতের বহু জাতি ও মানুষের ঘটনা স্মরণ করিয়েছে, যাতে মানুষ সেখান থেকে শিক্ষা নেয়। কিন্তু ইসলাম মানুষকে অতীতে আটকে থাকতে শেখায় না। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে, সে আগামীকালের জন্য কী পাঠিয়েছে।'(সূরা আল-হাশর, ৫৯:১৮)
এই আয়াতের আলোকে বলা যায়, একজন মুমিন অতীতকে স্মরণ করতে পারেন, অতীতের ভালো দিক থেকে শিক্ষা নিতে পারেন; কিন্তু তার জীবনের প্রধান দৃষ্টি হওয়া উচিত সামনে বিশেষত আখিরাতের দিকে।
সুতরাং এআই দিয়ে আশি-নব্বইয়ের আদলে নিজের একটি ছবি তৈরি করলেই তা হারাম হয়ে যায় এমন কথা বলার সুযোগ নেই। সমসাময়িক জর্ডানের ইফতা বিভাগও এআইয়ের মাধ্যমে ছবি রূপান্তরের বিষয়ে মূলনীতি হিসেবে বলেছে, ছবির বিষয়বস্তু ও ব্যবহার যদি শরিয়াহবিরোধী না হয়, তাহলে তা অনুমোদনযোগ্য হতে পারে। তবে অশালীনতা, পর্দাহীনতা, বিদ্রূপ, হয়রানি, প্রতারণা ও মিথ্যা উপস্থাপন থেকে বিরত থাকার শর্ত তারা স্পষ্ট করেছে।
অর্থাৎ ইসলামের বিচারে এখানে এআই নয়, ব্যবহারের ধরনটাই মূল বিষয়।
কেউ যদি নিজের ছবিকে পুরোনো সময়ের নান্দনিকতায় রূপান্তর করেন শুধু স্মৃতি, সৃজনশীলতা বা বিনোদনের জন্য এবং তাতে কোনো অশ্লীলতা, অনৈতিকতা বা প্রতারণা না থাকে, তাহলে শুধু আশি-নব্বইয়ের আবহ ব্যবহার করার কারণে সেটিকে নিষিদ্ধ বলা যায় না।
কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয় তখন, যখন সেই নস্টালজিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় এমন কিছু, যা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। অশালীন পোশাক, শরিয়াহবিরোধী উপস্থাপন, নারী-পুরুষের অনৈতিক প্রদর্শন, অন্যের ছবি বিকৃত করে প্রচার, কিংবা কোনো কাল্পনিক ছবিকে বাস্তব ছবি হিসেবে উপস্থাপন এসবের কোনোটিই এআই ব্যবহারের কারণে বৈধ হয়ে যায় না।
বিশেষ করে মিথ্যা উপস্থাপনের বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এআই এমন ছবি তৈরি করতে পারে, যা দেখতে একেবারে পুরোনো দিনের বাস্তব ছবি বলে মনে হয়। অথচ ছবিটি কখনো তোলা হয়নি। তাই সেটিকে যদি নিছক ‘AI-generated’ বা কল্পিত পুনর্নির্মাণ হিসেবে প্রকাশ করা হয়, বিষয়টি একরকম; আর যদি মানুষকে বোঝানো হয় যে এটি সত্যিকার অর্থে সেই সময়ের তোলা ছবি, তাহলে সেখানে প্রতারণার প্রশ্ন এসে যায়। জর্ডানের ইফতা বিভাগও এআই-নির্মিত ছবিকে মিথ্যা, জালিয়াতি বা প্রতারণার কাজে ব্যবহার না করার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে।
এখানে ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা মনে রাখা দরকার কোনো যুগকে শুধু পুরোনো হওয়ার কারণে আদর্শ মনে করা যাবে না।
আশি বা নব্বইয়ের দশকে ভালো কিছু ছিল, আবার খারাপও ছিল। সেই সময়ের পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক সম্প্রীতি, সরল জীবন কিংবা প্রযুক্তিনির্ভরতার কমতি কারও কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। কিন্তু একই সময়ের এমন অনেক সংস্কৃতি বা বিনোদনও ছিল, যা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই ‘সেই সময়টাই ভালো ছিল’ এমন অন্ধ আবেগ ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নয়।
ইসলাম ভালোকে ভালো হিসেবে গ্রহণ করতে বলে, সময়ের কারণে নয়; আর মন্দকে মন্দ হিসেবে বর্জন করতে বলে, সেটি পুরোনো কিংবা নতুন যাই হোক না কেন।
ছবি তৈরির ক্ষেত্রেও আলেমদের মধ্যে ফিকহি মতভেদ রয়েছে। মিসরের দারুল ইফতা আধুনিক ফটোগ্রাফি ও মানুষের ছবি নিয়ে আলেমদের বিভিন্ন মত উল্লেখ করে দেখিয়েছে যে এ বিষয়ে একক ও সর্বসম্মত অবস্থান নেই; একই সঙ্গে তারা ছবি ও শিল্পকে বৈধ রাখার ক্ষেত্রে অশ্লীলতা ও অন্যান্য নিষিদ্ধ বিষয় থেকে মুক্ত থাকার শর্তের কথা বলেছে।
তাই আশি-নব্বইয়ের এআই ছবির প্রবণতাকে বিচার করার সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি হলো ছবিটি কেন বানানো হচ্ছে, কী দেখানো হচ্ছে এবং কীভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে—এই তিনটি বিষয় দেখা।
নস্টালজিয়া মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। অতীতের সুন্দর স্মৃতি মানুষকে আবেগী করতেই পারে। কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য অতীত কোনো আশ্রয়স্থল নয়; বরং শিক্ষা নেওয়ার জায়গা। গতকাল চলে গেছে, আজ হাতে আছে, আর আগামীকাল বিশেষত আখিরাত তার জন্য অপেক্ষা করছে।
এআই হয়তো কয়েক সেকেন্ডে একজন মানুষকে আশি বা নব্বইয়ের দশকের ছবির ভেতর দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, ছবিতে অতীতে ফিরে যাওয়ার চেয়ে জীবনে অতীতের ভালোটা ফিরিয়ে আনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই পুরোনো দিনের পোশাকে একটি ছবি বানানোই মূল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো আমরা কোন অতীতকে ভালোবাসছি, কেন ভালোবাসছি এবং সেই ভালোবাসা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
একজন মুসলমানের নস্টালজিয়া যদি তাকে পরিবার, সরলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার দিকে ফিরিয়ে নেয়, তবে তা হতে পারে স্মৃতির সৌন্দর্য। আর যদি তা তাকে হারাম সংস্কৃতি, অশ্লীলতা, মিথ্যা বা আখিরাত-বিস্মৃতির দিকে নিয়ে যায়, তাহলে সেই নস্টালজিয়া আর নির্দোষ আবেগ থাকে না। ❝ইসলামের কাছে সময়ের সৌন্দর্য তার দশকে নয়—তার নৈতিকতায়।❞
(লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর)
