রাজকুনোয়ার থেকে লুৎফুন্নেসা: পলাশীর ইতিহাসে এক নারীর প্রেম, বন্দিত্ব ও বিস্মৃত জীবন  :  সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রীকে ঘিরে ইতিহাস, জনশ্রুতি ও পরস্পরবিরোধী তথ্যের অনুসন্ধান!  

Uncategorized ইতিহাস ঐতিহ্য জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক  :   বাংলার ইতিহাসে পলাশীর যুদ্ধের কথা উঠলেই সামনে আসে সিরাজউদ্দৌলা, মীরজাফর, রবার্ট ক্লাইভ এবং ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস। কিন্তু সেই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে করুণ মানবিক অধ্যায়গুলোর একটি জুড়ে রয়েছেন একজন নারী—সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রী লুৎফুন্নেসা বেগম।


বিজ্ঞাপন

তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রেম, ত্যাগ, বন্দিত্ব ও স্বামীর স্মৃতির প্রতি একনিষ্ঠতার অসংখ্য গল্প। বাংলা সাহিত্য, জনপ্রিয় ইতিহাস ও বিভিন্ন সংবাদ-ফিচারে এসব কাহিনি নানা রূপে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। কিন্তু এসবের সবকটি একই মাত্রায় ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়।
ফলে লুৎফুন্নেসার জীবন নিয়ে আলোচনা করতে হলে একটি বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন—কোনটি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, কোনটি পরবর্তী ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং কোনটি মূলত প্রচলিত কাহিনি।

রাজকুনোয়ার ছিলেন কি লুৎফুন্নেসার আগের নাম ?লুৎফুন্নেসার প্রথম জীবনের সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনি হলো—তিনি ছিলেন হিন্দু পরিচারিকা এবং তাঁর পূর্বনাম ছিল রাজকুনোয়ার। বলা হয়, তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলার মা আমিনা বেগমের পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। সিরাজ তাঁর রূপ ও ব্যবহারে আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন এবং পরে বিয়ে করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর নাম হয় লুৎফুন্নেসা।


বিজ্ঞাপন

এই বর্ণনাটি একেবারে ভিত্তিহীন নয়; পরবর্তী ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক বর্ণনায় এটি পাওয়া যায়। তবে রাজকুনোয়ার নামটি এবং তাঁর হিন্দু পরিচারিকা হিসেবে প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে সমসাময়িক প্রাথমিক দলিলের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী—তা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। একটি বাংলা ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁকে সিরাজের মায়ের পরিচারিকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, সিরাজের পছন্দের কারণে তাঁকে হারেমে স্থান দেওয়া হয়। একই সূত্রে ১৭৪৬ সালে সিরাজের প্রথম বিয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ‘রাজকুনোয়ার থেকে লুৎফুন্নেসা’ কাহিনিটি প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু একে নিঃসংশয় প্রাথমিক দলিল-সমর্থিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।


বিজ্ঞাপন

সিরাজের প্রথম স্ত্রী কে ছিলেন ?  এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। সিরাজউদ্দৌলার প্রথম বিবাহ হয়েছিল উমদাতুন্নেসা বা বানু বেগমের সঙ্গে। একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ১৭৪৬ সালে আলীবর্দী খাঁ এই বিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে লুৎফুন্নেসা সিরাজের জীবনে বিশেষ প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং তাঁকে প্রধান বেগমের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে ‘উমদাতুন্নেসা সবসময় আনন্দ-বিলাসে মগ্ন ছিলেন’—এ ধরনের চরিত্রগত মূল্যায়নকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে লেখা ঠিক হবে না। এটি মূলত পরবর্তী বর্ণনার অংশ।

পলাশীর পর লুৎফুন্নেসা: প্রেম নাকি ঐতিহাসিক বাস্তবতা ?
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটে। এরপর তিনি মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে পালানোর চেষ্টা করেন। লুৎফুন্নেসা তাঁর সঙ্গে ছিলেন—এ তথ্য বিভিন্ন পরবর্তী ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।

জনপ্রিয় কাহিনিতে বলা হয়, সিরাজ একা পালাতে চেয়েছিলেন এবং লুৎফুন্নেসা তাঁকে একা যেতে দেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি ও তাঁর কন্যা সিরাজের সঙ্গে পালিয়ে যান।

বাংলা সংবাদমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর একটি ঐতিহাসিক ফিচারেও এই বর্ণনা রয়েছে—পলাশীর পর সিরাজ একা পালাতে চাইলেও লুৎফুন্নেসা তাঁর সঙ্গে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং ১৭৫৭ সালের ২৫ জুন রাতে সিরাজের সঙ্গে তিনি ও তাঁদের কন্যা পালিয়ে যান বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এখানে ‘তিন দিন তিন রাত অনাহারে থাকা’, পথের নির্দিষ্ট ঘটনাবলি কিংবা তাঁদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রচলিত বিবরণগুলোর সবকটির প্রাথমিক দলিলভিত্তিক নিশ্চয়তা এক নয়। তাই এসব ক্ষেত্রে ‘বর্ণনা অনুযায়ী’ বা ‘প্রচলিত ইতিহাসে বলা হয়’ ব্যবহার করাই অধিক সতর্ক সাংবাদিকতা।

সিরাজের পরিণতি এবং লুৎফুন্নেসার বন্দিত্ব  :  সিরাজউদ্দৌলা ধরা পড়েন এবং পরে মীরজাফরের পুত্র মীরণের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়—পলাশী-পরবর্তী ইতিহাসের এই অংশটি সুপ্রতিষ্ঠিত। এরপর সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যাকে বন্দি করা হয়। ঢাকার জিনজিরা প্রাসাদ তাঁদের বন্দিত্বের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত।

বাংলাদেশ সরকারের জিনজিরা ইউনিয়নের সরকারি ওয়েব সাইটেও উল্লেখ রয়েছে যে সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেসা ও তাঁর শিশুকন্যাকে জিনজিরা প্রাসাদে বন্দি রাখা হয়েছিল। একই সরকারি বর্ণনায় বলা হয়েছে, পরবর্তীতে ক্লাইভের হস্তক্ষেপে লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা রক্ষা পান এবং তাঁদের মুর্শিদাবাদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

একাডেমিক গবেষণাতেও জিনজিরা দুর্গে আমিনা বেগম, ঘসেটি বেগম ও লুৎফুন্নেসার বন্দিত্বের ঐতিহ্যগত বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে গবেষণাটিতে জিনজিরা প্রাসাদের নির্মাণকাল ও নির্মাতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে কিছু মতভেদের কথাও বলা হয়েছে। এ কারণে ‘১৬৯৭ সালে দ্বিতীয় ইব্রাহিম খানই নিশ্চিতভাবে প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন’—এমন নিশ্চয়তামূলক বাক্য ব্যবহার না করাই ভালো।

সাত বছরের বন্দিত্ব—কতটা নিশ্চিত ?  লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যার জিনজিরা বন্দিত্বের কথা বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এটিকে ১৭৫৮ থেকে সাত বছরের বন্দিত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে অন্য বর্ণনায় বন্দিত্বের সময়কাল নিয়ে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশ সরকারের জিনজিরা ইউনিয়নের ওয়েবসাইটেও দীর্ঘ বন্দিত্বের কথা বলা হলেও একই পৃষ্ঠায় বিভিন্ন সময়কাল-সংক্রান্ত বর্ণনা রয়েছে।

সুতরাং সাংবাদিকতার ভাষায় বলা নিরাপদ  : ‘১৭৫৮ সালের পর লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যাকে ঢাকার জিনজিরা প্রাসাদে বন্দি রাখা হয়েছিল; বিভিন্ন বর্ণনায় তাঁদের বন্দিত্বের মেয়াদ প্রায় সাত থেকে আট বছর বলা হয়েছে।’

মীরজাফর বা মীরণের বিয়ের প্রস্তাব—ইতিহাস নাকি জনশ্রুতি?
লুৎফুন্নেসাকে ঘিরে সবচেয়ে আবেগঘন গল্পগুলোর একটি হলো—মীরজাফর ও তাঁর ছেলে মীরণ তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এই কাহিনি বহু বাংলা ফিচার ও ঐতিহাসিক রচনায় পাওয়া যায়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর একটি ফিচারেও মীরজাফর ও মীরণের পক্ষ থেকে লুৎফুন্নেসাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই দাবিকে সমসাময়িক সরকারি দলিলের মাধ্যমে নিশ্চিত না করে ‘প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী’ বলা অধিক সতর্ক। অর্থাৎ, ‘তিনি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন’—এটি জনপ্রিয় লুৎফুন্নেসা-কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও একে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করার আগে প্রাথমিক দলিল যাচাই প্রয়োজন।

খোশবাগে ফিরে এলেন লুৎফুন্নেসা৷ :  সিরাজের মৃত্যুর পর লুৎফুন্নেসার জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী ঐতিহাসিক স্মৃতি হলো খোশবাগ। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, মুর্শিদাবাদে ফিরে আসার পর লুৎফুন্নেসাকে সিরাজ ও আলীবর্দী খাঁর সমাধির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘদিন সিরাজের সমাধির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেখানে নিয়মিত ধর্মীয় আচার পালন করতেন বলে বর্ণনা রয়েছে। এখানে ‘খোশবাগে একটি কুঁড়েঘর বানিয়ে সারাজীবন বসবাস’—এই জনপ্রিয় বর্ণনাটি সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। কারণ বিভিন্ন সূত্রে তাঁর সমাধির তত্ত্বাবধান, বসবাস ও জীবনযাপনের বিবরণে পার্থক্য আছে।

মাসিক ভাতা নিয়েও রয়েছে বড় অসঙ্গতি  :  লুৎফুন্নেসার ভাতা নিয়ে পাওয়া তথ্য আরও সতর্কতার দাবি রাখে। কোথাও মাসিক ৬০০ টাকা, কোথাও ৩০৫ টাকা, আবার অন্য একটি বর্ণনায় ১০০ টাকা মাসোহারা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি ঐতিহাসিক রচনায় বলা হয়েছে, সমাধির তত্ত্বাবধানের জন্য তিনি মাসে ৩০৫ টাকা এবং আলাদা করে ১০০ টাকা মাসোহারা পেতেন।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক একটি অনলাইন বর্ণনায় ১৭৭৩ সালের একটি সরকারি আদেশের উদ্ধৃতি দিয়ে লুৎফুন্নেসার জন্য মাসিক ১ হাজার টাকা ভাতার দাবি করা হয়েছে। এই পরস্পরবিরোধী তথ্যের কারণে ‘কোম্পানি তাঁকে মাসে ৬০০ টাকা দিত’—এমন বক্তব্য সরাসরি প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা ঠিক হবে না। মূল সরকারি আদেশের কপি বা কোম্পানির মূল নথি যাচাই করা গেলে তবেই নির্দিষ্ট অঙ্কটি নিশ্চিতভাবে প্রকাশ করা উচিত।

লুৎফুন্নেসার মৃত্যুসন নিয়েও প্রশ্ন  :  আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি তাঁর মৃত্যুসন নিয়ে। একটি সরকারি স্থানীয় ইতিহাস-সংক্রান্ত ওয়েবপেজে তাঁর মৃত্যু ১৭৯০ সালে বলা হয়েছে। অন্যদিকে একটি ঐতিহাসিক রচনায় তাঁর মৃত্যু ১৭৯৫ সালের নভেম্বর মাসে হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।

অতএব প্রতিবেদনে নির্দিষ্টভাবে ‘১৭৯০ সালে’ বা ‘১৭৯৫ সালে’ লিখে দেওয়ার আগে প্রাথমিক সূত্র যাচাই প্রয়োজন। বরং লেখা যেতে পারে— তাঁর মৃত্যুসন নিয়েও ঐতিহাসিক সূত্রে মতভেদ রয়েছে; বিভিন্ন বর্ণনায় ১৭৯০ ও ১৭৯৫—দুই সালই পাওয়া যায়।’

যে গল্পটি ইতিহাসের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে  :  লুৎফুন্নেসার জীবনকে ঘিরে সময়ের সঙ্গে একটি রোমান্টিক কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে—তিনি নাকি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সিরাজের কবরের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করেছেন, সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালিয়েছেন এবং স্বামীর স্মৃতির প্রতি একনিষ্ঠ থেকেছেন।

এই বর্ণনার কিছু অংশ ঐতিহাসিক রচনায় পাওয়া যায়। বিশেষ করে সমাধির তত্ত্বাবধান এবং নিয়মিত সন্ধ্যাপ্রদীপ দেওয়ার কথা একটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ‘৩০ বছর ধরে প্রতিদিন কবরের পাশে বসে ছিলেন’, ‘সব আয় দিয়ে প্রতিদিন কাঙালি ভোজ করতেন’ কিংবা তাঁর জীবনের প্রতিটি ত্যাগের নির্দিষ্ট বিবরণ—এসবের ক্ষেত্রে প্রাথমিক দলিলের অবস্থান আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ইতিহাসের আড়ালে থাকা নারী  :  লুৎফুন্নেসার জীবনকে তাই শুধু ‘অমর প্রেমের কাহিনি’ হিসেবে দেখলে ইতিহাসের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। তিনি ছিলেন এমন এক সময়ের নারী, যখন বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। সিরাজের উত্থান ও পতন, পলাশীর যুদ্ধ, মীরজাফরের ক্ষমতায় আসা, ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রমবর্ধমান প্রভাব—সবকিছুর অভিঘাত তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ওপর সরাসরি পড়ে। একদিকে তিনি ছিলেন নবাবের স্ত্রী; অন্যদিকে রাজনৈতিক পরাজয়ের পর তিনিই হয়ে ওঠেন পরাজিত পরিবারের এক বন্দিনী নারী।

জিনজিরা প্রাসাদে তাঁর বন্দিত্বের স্মৃতি, মুর্শিদাবাদে প্রত্যাবর্তন এবং খোশবাগের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক—এসব তথ্য ইতিহাসে তাঁর উপস্থিতিকে স্পষ্ট করে। কিন্তু তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি অসংখ্য আবেগঘন গল্পের ভেতর থেকে ইতিহাসসম্মত তথ্য আলাদা করাও জরুরি। কারণ ইতিহাস শুধু ভালোবাসার গল্প নয়; ইতিহাস হলো দলিল, সূত্র, সময়কাল এবং প্রমাণেরও বিষয়।

শেষ কথা :  রাজকুনোয়ার থেকে লুৎফুন্নেসা—এই রূপান্তরের কাহিনি বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় নারী-কেন্দ্রিক আখ্যানগুলোর একটি। কিন্তু তাঁর জীবনকে ঘিরে যত গল্প প্রচলিত হয়েছে, তার সবকটিকে একই মাত্রায় ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

যা তুলনামূলকভাবে প্রতিষ্ঠিত: সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে লুৎফুন্নেসার সম্পর্ক, পলাশীর পর তাঁর পরিবারের বিপর্যয়, লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যার বন্দিত্ব এবং জিনজিরা প্রাসাদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক, পরে মুর্শিদাবাদে প্রত্যাবর্তন এবং সিরাজের সমাধির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক।

যা ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে পাওয়া যায়, কিন্তু আরও প্রাথমিক প্রমাণ প্রয়োজন: রাজকুনোয়ার নাম, তাঁর হিন্দু পরিচারিকা হিসেবে পরিচয়, মীরজাফর-মীরণের বিয়ের প্রস্তাব, নির্দিষ্ট বন্দিত্বকাল এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বহু আবেগঘন বিবরণ।

যেখানে সূত্রের মধ্যে সরাসরি অসঙ্গতি রয়েছে: লুৎফুন্নেসার ভাতার পরিমাণ এবং তাঁর মৃত্যুসন। এসব ক্ষেত্রে মূল কোম্পানি নথি, সমসাময়িক চিঠিপত্র ও সরকারি আদেশ যাচাই ছাড়া নির্দিষ্ট তথ্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।

পলাশীর ইতিহাসে তাই লুৎফুন্নেসা শুধু ‘সিরাজের বেগম’ নন। তিনি একই সঙ্গে ইতিহাস, স্মৃতি এবং কিংবদন্তির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী—যাঁর জীবনকে বুঝতে হলে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন দলিলেরও।

👁️ 19 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *