
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের রাজনীতিতে ত্যাগ, আদর্শ ও দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস যাদের পরিচয়ের মূল ভিত্তি, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম তাদের মধ্যে অন্যতম। তার রাজনৈতিক জীবন কেবল ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং সংগ্রাম, কারাবরণ, হামলা-মামলা মোকাবিলা এবং আদর্শিক অবস্থানে অটল থাকার এক দীর্ঘ পথচলার সাক্ষ্য বহন করে।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাকে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী করার দাবি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ—সেটিই বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক পুঁজি : ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ তার রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে শক্ত ভিত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি নৈতিক বৈধতারও উৎস। যুদ্ধকালীন সাহসিকতা তাকে তৃণমূল পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে একটি আলাদা মর্যাদা তৈরি করেছে। একজন রণাঙ্গনের বীর সেনানী হিসেবে তার অতীত তাকে জাতীয় সংকট বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেওয়ার নৈতিক শক্তি দেয়—যা মন্ত্রিত্বের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় দৃঢ় অবস্থান : রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়ে, যখন দলের ওপর ঝড় বয়ে গেছে, তিনি রাজপথ ছাড়েননি। হামলা, মামলা ও কারাবরণ—এসব অভিজ্ঞতা তাকে কেবল অভিজ্ঞ রাজনীতিকই বানায়নি, বরং দলের সংকটকালে পরীক্ষিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে “পরীক্ষিত নেতৃত্ব” একটি বড় রাজনৈতিক সম্পদ। বিশেষত, যারা প্রতিকূল সময়ে দল ছাড়েননি, তারা সাধারণত সংগঠনের ভেতরে ও বাইরে উভয় জায়গাতেই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেন।
প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও ডেপুটি মেয়র হিসেবে ভূমিকা : ঢাকা সিটির ডেপুটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রশাসনিক দক্ষতা ও সততার পরিচয় দিয়েছেন—এমন মূল্যায়ন রাজনৈতিক মহলে রয়েছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় কাজ করার অভিজ্ঞতা একজন নেতাকে বাস্তব প্রশাসনিক জটিলতা, জনসেবা কাঠামো এবং বাজেট ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেয়।
এই অভিজ্ঞতা তাকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রস্তুত বলে মনে করার যুক্তি তৈরি করে। কারণ স্থানীয় সরকারই হলো জাতীয় প্রশাসনের ক্ষুদ্র সংস্করণ।
পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী করার রাজনৈতিক বার্তা কী হতে পারে ? ত্যাগের স্বীকৃতি: দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে এটি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করবে।
তৃণমূলের বার্তা: তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতাকে মন্ত্রী করা হলে সংগঠনের নিচের স্তরে ইতিবাচক বার্তা যাবে—যে দীর্ঘ পরিশ্রম ও আনুগত্যের মূল্যায়ন হয়।
নৈতিক নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি : দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে জর্জরিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সততা ও সাদামাটা জীবনযাপন ইমেজকে সামনে আনা একটি কৌশলগত সিদ্ধান্তও হতে পারে। বাস্তব রাজনৈতিক বিবেচনা তবে মন্ত্রিত্ব কেবল নৈতিক বা আবেগের প্রশ্ন নয়, এটি রাজনৈতিক ভারসাম্য, দলীয় সমীকরণ, আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব ও জোট রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। দলীয় ভেতরে প্রভাবশালী অন্যান্য নেতাদের অবস্থান সংসদীয় ও জোটগত ভারসাম্য নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জন্য টেকনিক্যাল দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা, এসব বিষয়ও বিবেচনায় আসবে।
উপসংহার : “যিনি যুদ্ধের ময়দানে জয়ী হতে জানেন, তিনি জানেন কীভাবে একটি মন্ত্রণালয় বা রাষ্ট্রকে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিতে হয়”—এই বক্তব্যটি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা বহন করে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালামকে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী করা হলে তা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যেতে পারে এবং দলীয় কর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও পরীক্ষিত নেতৃত্বকে সামনে আনার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়, অভিজ্ঞতা, সততা ও ত্যাগ—এই তিন উপাদানের সমন্বয় যাদের মধ্যে রয়েছে, তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। আব্দুস সালাম সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বলেই রাজনৈতিক মহলে এমন দাবি জোরালো হচ্ছে।
