
নিজস্ব প্রতিবেদক : সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্যকে “সমঝোতা” বা “অলিখিত বিধি” বলে আখ্যা দেওয়া হলেও, বাস্তবতা হলো— এটি একটি সুপরিকল্পিত অবৈধ অর্থনীতি, যা আইন ও নৈতিকতার চোখে শুদ্ধ নয়। সমাজের বিবেক এখন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার।

চাঁদা মানেই হলো জোরপূর্বক অর্থ আদায়। সেটা হোক শ্রমিক সংগঠনের নামে, মালিক সমিতির নামে, বা রাজনৈতিক ক্যাডারদের নামে— নাম যাই হোক, সংজ্ঞা একই। একজন সাধারণ চালক বা মালিককে যদি তার রুট চালানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট টাকা “দিতেই হয়”, তাহলে সেটি বাধ্যতামূলক আদায়, কোনো স্বেচ্ছাধীন দান নয়। এই জোরপূর্বক আদায়ের কোনো আইনি বৈধতা নেই l
বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান আইন বলছে, কেউ কারও কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ দাবি করতে পারে না। পুলিশ ও প্রশাসনের দায়িত্ব এই অনাচার বন্ধ করা। কিন্তু বাস্তবে এই অবৈধ টোল আদায় হয় প্রকাশ্যে, প্রশাসনের চোখের সামনে। প্রশাসন যখন এতে নীরব থাকে, তখন তা আইনের শাসনের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করে এবং রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে তোলে।

এই অবৈধ অর্থের উৎস কিন্তু চালক বা মালিক নন। এর মূল ভার বহন করেন জনগণ। চাঁদা দিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে চালক ভাড়া বাড়ান। ফলে বাড়ে নিত্যপণ্যের দাম। ঢাকায় যানজটের একটি বড় কারণও এই চাঁদা আদায়ের জন্য রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা “লাইনম্যান” বা ম্যানুয়াল ট্রাফিক। একজন শ্রমিকের দাবি পূরণের নামে গোটা জাতিকে জিম্মি করা হচ্ছে।

মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, রুটে যারাই ক্ষমতায় থাকে, তাদের দলের লোকদের আধিপত্য থাকে। অর্থাৎ, এই চাঁদার টাকা চলে যায় রাজনৈতিক গোষ্ঠীর তহবিলে। এটি কোনো কল্যাণ তহবিল নয়; এটি একটি গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ার। মন্ত্রীকে তার নিজের দলের ভেতরে থাকা এই চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, তাদের পক্ষ নিলে হবে না l
সমাজে বহু অলিখিত বিধি ছিল যা অন্যায় ছিল— সতীদাহ, যৌতুক, বাল্যবিবাহ। মানুষ সেগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং আইন করেছে। চাঁদাও সেই একই ক্যাটাগরির একটি সামাজিক ব্যাধি। এটাকে “ঐতিহ্য” বা “বিধি” বলে মানিয়ে নেওয়া যায় না। এটাকে নির্মূল করতেই হবে।
সাধারণ মানুষ এখন আর চুপ করে নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বক্তব্যের প্রতিবাদে ঝড় উঠেছে। আমরা দাবি জানাই:
১. পুলিশ ও প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হবে। রাস্তায় রাস্তায় চলা এই চাঁদাবাজদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
2. জনগণের রক্তচোষা এই ব্যবস্থাকে “সমঝোতা” বলে আখ্যা দেওয়া একটি লজ্জাকর বক্তব্য। এই বক্তব্যের জন্য মন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং তার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানাই।
৩. পরিবহন খাতে উত্তোলিত এই অর্থের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দেখতে হবে, এই টাকার ভাগ বসাচ্ছে কারা, কোথায় জমা হচ্ছে এই অর্থ।
চাঁদা কোনো সমঝোতা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই এখন দেশপ্রেম।
