
আনিস আহমেদ, ম্যারিল্যান্ড, (ইউএসএ) ; বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও চমক। তারেক জিয়া নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর আসনে ড. খলিলুর রহমানকে বসানো নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনা।

যাঁকে মাত্র কয়েক মাস আগেও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের কেউ কেউ দ্বৈত নাগরিকত্ব ও দেশের প্রতি আস্থার প্রশ্ন তুলে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন, তাকেই আজ মন্ত্রিসভার সারিতে স্থান দিতে হলো—এই নাটকীয় পরিবর্তনই এখন মূল আলোচ্য। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কৌশলগত বাস্তবতা, নাকি রাজনৈতিক প্রয়োজনের কাছে আদর্শিক অবস্থানের পরাজয়?
সমালোচনা থেকে স্বীকৃতি: কী বদলালো ? ড. খলিলুর রহমানকে নিয়ে অতীতে বিএনপির ভেতরে যে সংশয় ও সমালোচনা ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। দ্বৈত নাগরিকত্বের ইস্যুতে তাঁকে হেনস্থা পর্যন্ত করা হয়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই অবস্থান যেন আমূল বদলে গেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের অনেকের সাথেই পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকদের সরাসরি ও কার্যকর সম্পর্ক নেই। যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের প্রশাসন, কংগ্রেস, সিনেট, পার্লামেন্ট কিংবা লর্ডস—এসব পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা সহজ কাজ নয়। সেখানে ড. খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক একটি বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পশ্চিমা যোগাযোগ: রাজনৈতিক মূলধন ? রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রচলিত ধারণা—ড. খলিলুর রহমান পূর্বে মুহাম্মদ ইউনুস সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর কিছু নীতিনির্ধারকের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতির বাস্তবতায় এই ধরনের যোগাযোগ কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সমালোচকদের ভাষায়, “যে দরজা অন্যদের জন্য বন্ধ, সেটি খুলে দিতে পারেন খলিলুর রহমান।” ফলে বিএনপির জন্য তিনি হয়ে উঠেছেন কূটনৈতিক সেতুবন্ধনের এক কার্যকর মাধ্যম।
বিকল্পহীনতা না কৌশল ? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অতীতে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি বা লবিস্টদের মাধ্যমে বিএনপির নেতারা পশ্চিমা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, এখন তাদের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ বা আগ্রহ কমে গেছে বলে শোনা যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্য ও পরিচিত মুখ হিসেবে ড. খলিলুর রহমান যেন হয়ে উঠেছেন একমাত্র কার্যকর বিকল্প। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আদর্শিক আপস নয়, বরং কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি সরকারের টিকে থাকা ও কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আস্থার ওপর।
দ্বৈত নাগরিকত্ব বিতর্ক: অতীতের ছায়া : তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—যে ইস্যুতে তাঁকে একসময় প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল, সেটি কি এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়? নাকি ক্ষমতার বাস্তবতায় সেই বিতর্ক চাপা পড়ে গেছে ? এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে বিএনপি কি একটি বার্তা দিল যে, ব্যক্তিগত বিতর্কের চেয়ে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাই এখন বড়? নাকি এটি দলের ভেতরে নতুন শক্তির উত্থানের ইঙ্গিত?
উপসংহার : ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী করা নিছক একটি মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাস্তববাদ বনাম বক্তব্যের লড়াইয়ের একটি উদাহরণ। সমালোচনা থেকে স্বীকৃতি—এই যাত্রা প্রমাণ করে, ক্ষমতার রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী মিত্র বলে কিছু নেই; আছে কেবল প্রয়োজন ও প্রাসঙ্গিকতা।
এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কূটনীতিতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে—আর দলীয় রাজনীতিতে এই সিদ্ধান্ত কতটা নতুন সমীকরণ তৈরি করে।
