
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর প্রশাসনিক অঙ্গনে যেন নতুন করে বিস্ফোরণ! দুর্নীতির মামলার আসামি হয়েও অল্প সময়ের ব্যবধানে একই গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে এসেছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়া। তার এই পুনর্বহাল প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শুদ্ধাচার নীতিমালার কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র প্রশ্নের ঝড় তুলেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

১ কোটি ২২ লাখ টাকার বিল—কাজ ছাড়াই উত্তোলনের অভিযোগ : অভিযোগের সূত্রপাত রাজধানীর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ ও পঞ্চম তলার নির্মাণকাজ ঘিরে। অভিযোগ—কাজ সম্পন্ন না করেই ১ কোটি ২২ লাখ ১৯ হাজার টাকা বিল উত্তোলন ও আত্মসাৎ। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাচ্চু মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর গত ১১ জানুয়ারি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাকে বদলি করা হয়। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন—এবার হয়তো কঠোর বার্তা গেল প্রশাসনে। কিন্তু সেই দৃশ্যপট স্থায়ী হয়নি বেশিদিন।
রিট, স্থগিতাদেশ, আর দ্রুত প্রত্যাবর্তন : সূত্র জানায়, বদলির আদেশের বিরুদ্ধে তিনি আদালতে রিট আবেদন করেন এবং সাময়িক স্থগিতাদেশ লাভ করেন। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় ঢাকা জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী পদে বহাল হন। প্রশ্ন উঠছে—এত দ্রুত কীভাবে? প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ কি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে? বিভাগীয় তদন্তের অগ্রগতি কতদূর? সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এখনো এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি।

অভিযোগের বিস্তৃতি ও বিল বাণিজ্য, সমঝোতা, ভয়ভীতি : অভিযোগ কেবল আর্থিক অনিয়মেই সীমাবদ্ধ নয়।
ঠিকাদারদের সঙ্গে অনৈতিক সমঝোতা, কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন, ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ—এসব অভিযোগও জনপরিসরে আলোচিত। এমনকি ঘুষ সংক্রান্ত অডিও রেকর্ড ও ইলেকট্রনিক যোগাযোগের স্ক্রিনশট নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

ফাইল ঘোরে, সিদ্ধান্ত থামে : প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ও মামলার ফাইল দীর্ঘসূত্রতায় অগ্রসর হচ্ছে। দৃশ্যমান শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার অগ্রগতি না থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলে অসন্তোষ বাড়ছে। অন্যদিকে একটি মহল দাবি করছে—অফিসের কার্যক্রম সচল রাখতে বিশেষ ব্যবস্থাপনা নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—কার্যক্রম সচল রাখার নামে কি অভিযোগের গুরুত্ব খাটো করা হয়েছে?
বিধিমালার বাস্তব প্রয়োগ কোথায় ? সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী গুরুতর আর্থিক অসদাচরণ বা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। সেই বিধান বাস্তবে কতটা প্রয়োগ হয়েছে—এ নিয়েই এখন বিতর্ক।
অস্বাভাবিক সম্পদ নিয়ে গুঞ্জন : অভিযোগ উঠেছে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের বিষয়েও। তবে সম্পদের উৎস ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি। ফলে বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তিহীন থাকলেও জনমনে সন্দেহের মেঘ ঘন হচ্ছে।
ঢাকা জেলা—সবচেয়ে সংবেদনশীল আসন : এলজিইডির ৬৪ জেলার মধ্যে ঢাকা জেলার গুরুত্ব বিশেষ। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, অবকাঠামোর মান ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার দিক থেকে এই জেলার অবস্থান প্রতীকীও বটে। এমন একটি জেলায় চলমান মামলার আসামির পুনর্বহাল প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে নীতিগত প্রশ্ন উসকে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, ঘটনাটি এখন প্রশাসনিক নৈতিকতা বনাম প্রভাবের লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। অভিযোগ আছে, মামলা আছে, তদন্ত আছে—কিন্তু দৃশ্যমান জবাবদিহিতা কোথায়? সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও সময়োপযোগী তদন্ত সম্পন্ন করে বিভাগীয় কার্যক্রম শেষ করাই সুশাসনের একমাত্র পথ।
এখন চোখ প্রশাসনের দিকে—তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া কত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে এগোয়, আর জবাবদিহিতা কতটা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। নাকি এই পুনর্বহালই হয়ে থাকবে “বার্তা”—দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও প্রভাবই শেষ কথা?
