
নিজস্ব প্রতিবেদক (চট্টগ্রাম) : দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর—যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকার কথা, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এখনো অদৃশ্য শক্তির মতো নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও আওয়ামীপন্থী একটি শক্তিশালী চক্র নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। তারা এখন প্রকাশ্যে বিরোধিতার নাটক করলেও আড়ালে অর্থের বিনিময়ে প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রেখেছে।

ফটিক সিন্ডিকেট: কারাগারে পৃষ্ঠপোষক, বাইরে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক : চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল কারাবন্দী থাকলেও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত সিবিএ নেতা নায়েবুল ইসলাম ফটিক এখনো অধরা।

অভিযোগ রয়েছে—তিনি আত্মগোপনে থেকেও বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রম, ঠিকাদারি ও নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন।

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, ফটিকের প্রভাবেই বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার চলেছে। তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বন্দরের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা, যাদের সহযোগিতায় পুরো একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।

পরিচালক পর্যায়ের সম্পৃক্ততা -অভিযোগের কেন্দ্রে পরিবহন বিভাগ : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিমসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই সিন্ডিকেটকে সহযোগিতা করছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন— কাজী মেরাজ উদ্দিন আরিফ, হাবুবুল্লাহ আজিম, সাইফুল হাসান চৌধুরী, অপূর্ব কুমার চক্রবর্তী এবং মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিন। অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মকর্তাদের সহায়তায় আত্মগোপনে থেকেও ফটিক বন্দরের টেন্ডার, পোস্টিং ও নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন।

বদলি নাটক ও ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ সেতু : গত ১৮ ডিসেম্বর কয়েকজন কর্মচারীকে বদলির নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী— রফিকুল ইসলাম সেতু নামে এক কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের ‘কালেক্টর’ হিসেবে কাজ করছেন।
তাকে সরিয়ে দিলে গোপন লেনদেন ফাঁস হয়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় বদলি ঠেকাতে ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করা হয়। পরবর্তীতে প্রভাবশালী মহলের চাপে চেয়ারম্যানকেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়।

ছাত্র আন্দোলনে দমন-পীড়ন, অভিযোগের নতুন মাত্রা : অভিযোগ রয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বন্দরের কিছু ছাত্রছাত্রীর তথ্য পুলিশকে সরবরাহ করে তাদের গ্রেফতারে সহায়তা করা হয়।
এই কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন ফটিক নিজেই—এমন দাবি স্থানীয় সূত্রের। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সেতুর বাসা ঘেরাও করলে সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাকে উদ্ধার করা হয়।

রাজনৈতিক রূপান্তর: আওয়ামী থেকে বিএনপি ব্যানারে ‘হাইব্রিড’ চক্র : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সিন্ডিকেটের অনেক সদস্য এখন দল বদলে বিএনপির ব্যানারে সক্রিয় হয়েছেন।
স্থানীয়রা বলছেন— “নতুন বোতলে পুরনো মদ”—নাম বদলালেও চরিত্র অপরিবর্তিত । এই হাইব্রিড নেতারা এখন শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে আবার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য-কোটি টাকার লেনদেন : সম্প্রতি ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে পরিবহন বিভাগে প্রায় ৭০ জন কর্মচারীর বদলি করা হয়। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি— এই বদলির আড়ালে কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। মেহেদী হাসান, সাজ্জাদ হোসেনসহ কয়েকজন কর্মচারীকে ঘুষ আদায়ের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের নজরে ফটিকসহ ৫ কর্মকর্তা : এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম বন্দরের ৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তলব করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ— অবৈধ সম্পদ অর্জন, নিয়োগ বাণিজ্য এবং প্রভাব খাটানো, ফটিক নিজে এসব অভিযোগ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করলেও তদন্ত চলমান রয়েছে।

সাইফ পাওয়ারটেক ও অর্থায়নের উৎস : এই সিন্ডিকেটের অর্থায়নের বড় অংশ আসছে বন্দর-সংশ্লিষ্ট বেসরকারি অপারেটরদের কাছ থেকে—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে একটি অপারেটর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ড ইস্যু: প্রকাশ্যে বিরোধিতা, আড়ালে সমঝোতা ?গোপন সূত্রে জানা গেছে—ডিপি ওয়ার্ল্ড ইস্যুতে প্রকাশ্যে বিরোধিতা দেখালেও, আড়ালে বড় অংকের কমিশনের বিনিময়ে সরকারি সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। শেখ নুরুল্লাহ বাহারের বিরুদ্ধে এই ইস্যুতে বিপুল অর্থ কমিশন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা : বন্দরের ভেতরে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে— তথ্য পাচার, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, প্রভাব খাটানো এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গ, এরকম অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।, ফলে প্রশাসনের ভেতরেই তৈরি হয়েছে ভয় ও অস্থিরতা।

অর্থনীতির জন্য হুমকি : বিশেষজ্ঞরা বলছেন,, চট্টগ্রাম বন্দর অস্থিতিশীল হলে পুরো দেশের অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়বে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব পড়বে —আমদানি-রপ্তানি,, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং শিল্প উৎপাদন।

উপসংহার –দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় সংকট : অনুসন্ধানে স্পষ্ট— রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও বন্দরের ভেতরের ক্ষমতার কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

দাবি উঠেছে— সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া, নিরপেক্ষ তদন্ত ওজবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, নচেৎ দেশের অর্থনীতির এই প্রধান প্রবেশদ্বার আরও বড় সংকটে পড়তে পারে। স্লোগান উঠছে আবারও: “বন্দর বাঁচাও, দেশ বাঁচাও”
