মিরপুর-১ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ‘অদৃশ্য সরকার’ ! সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে জিম্মি সাধারণ মানুষ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  : রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস যেন আর সরকারি প্রতিষ্ঠান নেই—এটি এখন অভিযোগ অনুযায়ী একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রিত ‘অদৃশ্য সরকার’।


বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, জালিয়াতি, ভয়ভীতি ও অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে অফিসটির কার্যক্রম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে ফজর আলী, সাগর, সবুজ, আলমসহ একটি শক্তিশালী চক্র—এমনটাই জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সূত্র বলছে, সাবেক নাইটগার্ড হাজী শাহাবুদ্দিনের প্রভাবকে পুঁজি করে এই সিন্ডিকেটের উত্থান। অফিস ভবনটিও তার ঘনিষ্ঠজনের মালিকানাধীন হওয়ায় কার্যত পুরো কাঠামোই তাদের প্রভাব বলয়ে চলে গেছে। ফলে সরকারি নজরদারি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।


বিজ্ঞাপন

“সাব-রেজিস্টার নয়, ‘সব রেজিস্টার ’!”  অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রকাশ্যেই বলে বেড়ায়—“মিরপুরে যে সাব-রেজিস্টার আসে, তাকে আমরা ‘সব রেজিস্টার’ বানিয়ে ফেলি।” এই এক বক্তব্যেই যেন ফুটে ওঠে তাদের প্রভাবের গভীরতা।


বিজ্ঞাপন

জাল দলিল থেকে জমির শ্রেণি পরিবর্তন—সবই ‘প্যাকেজ সেবা’   : ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জাল দলিল তৈরি, ভুয়া তথ্য ব্যবহার, এমনকি জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মতো গুরুতর অনিয়মও এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সহজেই সম্পন্ন হয়। এর ফলে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব। অফিসে সেবা নিতে গেলে নির্দিষ্ট এই সিন্ডিকেটের ‘চ্যানেল’ ছাড়া কোনো কাজই এগোয় না। ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা, অযথা জটিলতা সৃষ্টি এবং হয়রানি যেন নিয়মিত ঘটনা।

নারীদের জন্য আলাদা চাপ :  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নারী নকলনবিশ জানান, অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

সাংবাদিকদেরও রেহাই নেই :  অভিযোগ উঠেছে, এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ বা অনুসন্ধান চালাতে গেলে সাংবাদিকদেরও ভয়ভীতি দেখানো হয়। ফলে অনেকেই বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে সাহস পান না।

তদারকির অভাবে ‘স্বাধীন রাজত্ব’ :  জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে অফিসটির দূরত্ব বেশি হওয়ায় কার্যত কোনো তদারকি নেই। এই সুযোগে সিন্ডিকেটের সদস্যরাই অফিস পরিচালনায় আধিপত্য বিস্তার করছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রাররাও তাদের চাপে জিম্মি হয়ে পড়েন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য : প্রতিটি দলিল নিবন্ধনের জন্য কয়েক হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। দালালদের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিত হয়। দারোয়ান আলমসহ কয়েকজন সদস্য অফিসে প্রবেশ থেকে শুরু করে ফাইল চলাচল পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করেন।

অবৈধ সম্পদের পাহাড় : অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেট সদস্যরা অবৈধ উপায়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—মিরপুর শাহআলী বাগে ৬.৫ তলা ভবন (বাড়ি নং ১১৬/এ, জনতা হাউজিং ৩ নম্বর গেট সংলগ্ন) ১৩টি ফ্ল্যাটবিশিষ্ট ভবনটি বর্তমানে আল-কারিম কিরাতুল কোরআন মাদরাসার কাছে ভাড়া দেওয়া। আনুমানিক মূল্য: ২০ কোটি টাকা, ‘তায়েফ ভবন’-এ ৫টি ফ্ল্যাট, পূর্ব শাহআলীবাগের ধানক্ষেত মোড়ে অবস্থিত (বাসা-৩৭), আনুমানিক মূল্য: ৪ কোটি টাকা, সাভারে ২০০ শতাংশ জমি, মশুরের গোলা এলাকায় অবস্থিত, মূল্য কয়েক কোটি টাকা, বিলাসবহুল মাইক্রোবাস, রেজিস্ট্রেশন নম্বর: ঢাকা মেট্রো-চ-৫১-২১১৭, এছাড়াও ফজর আলী, সাগর, সবুজ, নয়ন, পিয়াস ও খোকনসহ চক্রটির সদস্যরা রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

“ভাঙা কঠিন এই সিন্ডিকেট” :  এক সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই অফিস পুরোপুরি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। তাদের অনুগত লোকজনের মাধ্যমেই সব লেনদেন হয়। এই চক্র ভাঙা অত্যন্ত কঠিন।”

অভিযোগ আছে, ব্যবস্থা নেই : দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে করে সিন্ডিকেটটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

সেবাগ্রহীতাদের আর্তনাদ : সাধারণ মানুষ বলছেন, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রতিনিয়ত হয়রানি, প্রতারণা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হচ্ছে তাদের।

দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি :  ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের একটাই প্রত্যাশা—“সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ হোক, সাধারণ মানুষ ফিরে পাক হয়রানিমুক্ত সেবা।”

👁️ 116 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *