বিআইডব্লিউটিএ ভবনে ‘টর্চার সেল’ কাণ্ড : নির্যাতনের শিকার কর্মচারী, শোকজে অভিযুক্ত—তবুও থামেনি প্রভাবশালী চক্র !

Uncategorized অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সংগঠন সংবাদ সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  : রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ভবনের নিচতলায় কথিত “টর্চার সেল” পরিচালনার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।


বিজ্ঞাপন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অভিযোগ, ভুক্তভোগীর লিখিত আবেদন এবং কর্তৃপক্ষের শোকজ নোটিশ—সব মিলিয়ে সামনে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র।

অভিযোগ উঠেছে, শ্রমিক লীগের সাবেক ও বর্তমানে রাজনৈতিক পরিচয় বদলানো একদল প্রভাবশালী কর্মচারী—মাজাহার, আক্তার ও শফিকের নেতৃত্বে—সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই গড়ে উঠেছে নির্যাতনের এক অঘোষিত কেন্দ্র।


বিজ্ঞাপন

লিফট অপারেটরকে ডেকে নিয়ে নির্যাতন   : গত ১৩ এপ্রিল ২০২৬, সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে বিআইডব্লিউটিএ ভবনের নিচতলায় লিফট অপারেটর মোঃ মিজানুর রহমান-কে ‘জরুরি কথা আছে’ বলে ইউনিয়ন কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়।


বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী,   সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন: মোঃ শফিকুল ইসলাম, (গেজপাঠক, হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ), গোলাম আক্তার (সহকারী, ড্রেজিং বিভাগ), কার্যালয়ে প্রবেশ করতেই তাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং এক পর্যায়ে শফিকুল ইসলাম তার গলা চেপে ধরে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারেন।

মিজানুর রহমান অভিযোগে উল্লেখ করেন—“আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে মারধর শুরু করে। পরে হুমকি দেয়—ঘটনার কথা কাউকে জানালে খুলনায় বদলি করা হবে।” তার চিৎকারে অন্য কর্মচারীরা এসে তাকে উদ্ধার করেন।

এটাই প্রথম নয়—বারবার নির্যাতনের অভিযোগ  : অভিযোগ রয়েছে, এর আগেও একই চক্রের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আজিজুল ইসলাম, মজিবুর রহমান, নুরুল আলম, আক্কাস হোসেনসহ আরও অনেকে, ভুক্তভোগীদের দাবি, ভয় ও চাকরি হারানোর আশঙ্কায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না।

২০১৬ থেকে গড়ে ওঠা ‘আধিপত্যের সাম্রাজ্য’ :  স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে শ্রমিক লীগ গঠনের মাধ্যমে এই গ্রুপটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। এরপর থেকে দখল, টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও থেমে থাকেনি তাদের কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর নতুন পরিচয়ে শ্রমিক দলের কমিটি এনে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রটি।

কর্মস্থলে না থেকেও প্রভাব বিস্তার  : অভিযোগ অনুযায়ী,
মাজাহারের কর্মস্থল বরিশালে হলেও নিয়মিত মতিঝিল অফিসে অবস্থান করেন, শফিকুল ইসলামের কর্মস্থল নারায়ণগঞ্জের পাগলা গেজ স্টেশন হলেও তিনি প্রায় প্রতিদিন ঢাকায় আসেন, তারা টেন্ডার, বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের রায় উপেক্ষা করে উপস্থিতি নিশ্চিত করার অভিযোগও উঠেছে।

আমাদের কিছুই করতে পারবে না”—অভিযোগে উদ্ধত বক্তব্য  :  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী জানান, অভিযুক্তরা প্রকাশ্যেই বলেন— “আমরা নতুন কমিটি নিয়ে এসেছি, যতদিন চাকরি আছে এভাবেই চলবে—পারলে কিছু করে দেখাও।”

কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন  :  সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন কর্মকাণ্ড চললেও কেন কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন নীরব—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী কিছু কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় এই ‘টর্চার সেল’ পরিচালিত হচ্ছে।

শোকজ নোটিশ: অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা ? ঘটনার পর ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ মোঃ শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করে।
নোটিশে বলা হয়, অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ , ঢাকা অফিসে এসে মারামারি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ, সহকর্মীকে গালিগালাজ ও শারীরিক নির্যাতন, এগুলো চাকুরী প্রবিধানমালা-১৯৯০ এর ৩৫(ক) ও ৩৫(খ) অনুযায়ী “অসদাচরণ” ও “দায়িত্বে অবহেলা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাকে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগীর আর্তি: “বিচার চাই” : মিজানুর রহমান তার লিখিত আবেদনে বলেন—“বিনা অপরাধে আমাকে নির্যাতন করা হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”

ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙবে কবে  ?  বিআইডব্লিউটিএ’র মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যদি এভাবে ‘টর্চার সেল’ পরিচালিত হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য নয়, পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্যই উদ্বেগজনক—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন দেখার বিষয়—শুধু শোকজেই শেষ হবে, নাকি ভেঙে দেওয়া হবে এই বহুল আলোচিত ‘টর্চার সেল’?

👁️ 37 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *