
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রকৌশল বিভাগ) এবং একাধিক মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (PD) এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সীমাহীন দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র, ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিআইডব্লিউটিএ’র বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পকে কার্যত ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন।
বিশেষ করে চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সন্দ্বীপ, কক্সবাজারের সোনাদিয়া, টেকনাফের সাবরাং ও জালিয়ার দ্বীপ এলাকায় বাস্তবায়নাধীন জেটি ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, নদী খনন, সমীক্ষা ও অবকাঠামো নির্মাণকাজে নিম্নমানের কাজ করিয়ে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত মাটি পরীক্ষা কিংবা বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে প্রকল্প এলাকায় বারবার চর জেগে ওঠা, ভাঙন ও নৌপথ সংকট তৈরি হচ্ছে। এতে একদিকে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে অপচয় হচ্ছে বিপুল সরকারি অর্থ।
অভিযোগ রয়েছে, এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামান একটি শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বড় বড় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন। নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে দরপত্র ভাগাভাগি, রেইট কোড সরবরাহ এবং পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরে তার নিজস্ব “ক্যাশিয়ার” রয়েছে বলেও দাবি করেছেন একাধিক সূত্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, “তিনি কমিশন ছাড়া কোনো কাজ করেন না। বড় টেন্ডারগুলো আগে থেকেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগ করে দেওয়া হয়। সাধারণ ঠিকাদারদের নানা ধরনের ভয়ভীতি, অপমান ও চাপ প্রয়োগ করা হয়।”
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল ও সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ ফ্ল্যাট, প্লট ও বাড়ি গড়ে তুলেছেন।

সূত্র মতে, তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বাসাবোর অপরাজিতা এলাকায় ৩২/বি/১ ও ৩২/বি/ই নম্বরের ফ্ল্যাট, বাসাবো এলাকায় ৭ তলা বাড়ি, শান্তিনগরে আলিশান ফ্ল্যাট, আহমেদবাগ এলাকায় ৩৩/বি ও ৩৩/সি নম্বরে একাধিক ফ্ল্যাট, মায়াকানন এলাকায় ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুর, বসিলা, ধানমন্ডি, ফতুল্লা, কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, পূর্বাচল, কালীগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ায় প্লট ও জমি, সবুজবাগ ও মুগদা এলাকায় বাড়ি, নিজ জেলা কুষ্টিয়ায় পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি।
অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের বড় অংশই সম্পদ বিবরণীতে গোপন রাখা হয়েছে এবং রাষ্ট্রকে ভুয়া ও অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়েছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে তিনি হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
গত ৫ আগস্টে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলন সংগ্রামের ফলে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও একইভাবে কমিশন বাণিজ্য ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রেখেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল বিএনপি সরকার গঠনের পর ও একই কাজে লিপ্ত থেকে বিভিন্ন প্রকারের অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন।
ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, বাজেট সংকট থাকা সত্ত্বেও তিনি শত শত কোটি টাকার টেন্ডার আহ্বান করেছেন এবং কমিশনের ভিত্তিতে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে একদিকে রাষ্ট্র হারাচ্ছে বিপুল অর্থ, অন্যদিকে সাধারণ ঠিকাদাররা বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নাম : Development of Jetties and Infrastructure at Mirsarai & Sandwip at Chattogram, Subrang and Jaliar Dwip at Teknaf and Sonadia Dwip at Cox’s Bazar. এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (PD) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামান।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি মোবাইল রিসিভ না করায় তার কোন প্রকার বক্তব্য প্রকাশিত হলো না।
সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল মহল, ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সচেতন মহলের দাবি : এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগসমূহ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
একইসঙ্গে তার অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
