
বিশেষ প্রতিবেদক : পটুয়াখালীর সুবিদখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজ-এ প্রভাষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন এবং জাল প্রশিক্ষণ সনদের অভিযোগ সামনে এসেছে।

দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর চাকরি ও সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলনের পর এখন প্রভাষক (কম্পিউটার শিক্ষা) উম্মে কুলসুমের উত্তোলিত ৪৮ লাখ ৪৯ হাজার ২৩৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে অডিট প্রতিবেদনে।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর এম. এম. সহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি অডিট প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, উম্মে কুলসুম ২৬ এপ্রিল ১৯৯৯ তারিখে প্রভাষক (কম্পিউটার শিক্ষা) পদে যোগদান করেন।

নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করে অডিট টিম দেখতে পায়, ২২ জুন ১৯৯৮ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় এবং ১২ মার্চ ১৯৯৯ তারিখে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, যা তৎকালীন বিধিমালা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ছিল।

অডিট প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ছাড়া নিয়োগ বোর্ড গঠন করায় পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াই বিধিবহির্ভূত হয়ে পড়ে।
শুধু তাই নয়, কম্পিউটার বিষয়ে প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য ন্যূনতম তিন মাসের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকলেও উম্মে কুলসুম বগুড়ার “সারেবক ন্যামাস” নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র ১ মাস ২৫ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ না হওয়ায় তার নিয়োগকে “বিধিসম্মত নয়” বলে মত দিয়েছে অডিট কর্তৃপক্ষ।
অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তিনি ২৬ আগস্ট ১৯৯৯ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করেন। পরে ১ মার্চ ২০২৪ থেকে কলেজটি সরকারিকরণ হওয়ার পর রাজস্ব খাত থেকেও বেতন গ্রহণ শুরু করেন।
এ অবস্থায় এমপিও খাত থেকে উত্তোলিত মোট ৪৮ লাখ ৪৯ হাজার ২৩৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি তার বেতন-ভাতা বন্ধের জন্য সংশ্লিষ্ট রাজস্ব অফিসে চিঠি দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রশ্নের মুখে পুরো নিয়োগ ও তদারকি ব্যবস্থা : ঘটনাটি সামনে আসার পর শিক্ষা প্রশাসনে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে— জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ছাড়া কীভাবে নিয়োগ সম্পন্ন হলো ? প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকলেও কেন নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল? দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে কীভাবে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন চললো ? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকিতে কোনো গাফিলতি বা যোগসাজশ ছিল কি না?
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে বলছেন, অডিট প্রতিবেদনের তথ্য সত্য হলে এটি শুধু একজন শিক্ষকের নিয়োগ অনিয়ম নয়; বরং পুরো নিয়োগ ও তদারকি ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতা ও জবাবদিহির সংকটের প্রতিচ্ছবি।
এদিকে অনুসন্ধানে কলেজের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, চাকরির সময় জমা দেওয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সনদটিও জাল হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে কলেজজুড়ে তীব্র আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য মেলেনি : এ বিষয়ে উম্মে কুলসুম কিংবা সুবিদখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজ কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অডিট প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
