
নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিদের পরিচয় ব্যবহার করে চাকরি দেওয়ার নামে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালিয়ে আসা এক ভয়ংকর প্রতারক চক্রের মূলহোতাসহ দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-১০। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ প্রতারণার এক বিস্ময়কর কাহিনি, যেখানে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট, ভুয়া পরিচয়, ফটোশপে তৈরি ‘ভিআইপি’ ছবি এবং চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা।

র্যাব জানায়, গ্রেফতারকৃত মূলহোতা মোঃ তারেক সরকার (৪০) নরসিংদী সদর এলাকার বাসিন্দা। তিনি বিগত প্রায় ছয় বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা চালিয়ে আসছিলেন। তার সহযোগী হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে মোঃ পলাশ কবির (৪২) নামে আরেক ব্যক্তিকে।
র্যাব-১০ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত তারেক সরকার মূলত চাকরিচ্যুত এক সাবেক সেনাসদস্য। ২০০৬ সালে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি সেই তথ্য গোপন করে কারা অধিদপ্তরে চাকরি নেন এবং প্রায় ১৪ বছর সেখানে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু বিভাগীয় মামলায় সেখান থেকেও চাকরিচ্যুত হন। দীর্ঘদিন সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবাদে প্রশাসনিক কাঠামো, কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা ও বাহিনীগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা অর্জন করেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাকেই পরবর্তীতে প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন।

তদন্তে জানা গেছে, প্রতারণার জন্য তারেক সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে ভুয়া ও তথাকথিত ‘ভিআইপি’ মোবাইল সিম সংগ্রহ করতেন। এরপর সেই নম্বর ব্যবহার করে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের নাম-পরিচয়ে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খুলতেন। ওই ভুয়া পরিচয়ে তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিতেন এবং সুপারিশ বাণিজ্য চালাতেন।
র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারেক সরকার স্বীকার করেছেন, চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা করে তিনি প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন। সাধারণ মানুষকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করতেন তিনি। একই সঙ্গে তার কর্মকাণ্ডে সরকারের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছিল।

র্যাব আরও জানায়, বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয় র্যাব-১০। এরপর একটি চৌকস আভিযানিক দল তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে প্রতারক চক্রটির অবস্থান শনাক্ত করে। অবশেষে গত ২৪ মে নরসিংদী সদরের সঙ্গীতা মোড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোঃ তারেক সরকারকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের পর তার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস, মোবাইল ফোন, সিমকার্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করা হয়। উদ্ধার হওয়া আলামতের মধ্যে একটি বাধাই করা ছবিও রয়েছে, যেখানে ফটোশপের মাধ্যমে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তারেক সরকারের ছবি সংযুক্ত করা হয়েছিল। র্যাব বলছে, এসব ভুয়া ছবি দেখিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতার ভান সৃষ্টি করতেন।
তারেক সরকারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব-১০ এবং বিজিবির একটি যৌথ দল রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তার সহযোগী মোঃ পলাশ কবিরকেও গ্রেফতার করে। এ সময় তার কাছ থেকেও প্রতারণাসংক্রান্ত বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়।
র্যাব জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, সে বিষয়েও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
র্যাব-১০ এর এই সফল অভিযানে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিচয় অপব্যবহারকারী চক্রের বিরুদ্ধে র্যাবের কঠোর অবস্থানকে প্রশংসা করছেন অনেকে।
