সুন্দরবনে চলছে মাছ ও কাকড়া শিকার

Uncategorized খুলনা গ্রাম বাংলার খবর জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

নইন আবু নাঈম তালুকদার (শরণখোলা)  :  বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে এখন চলছে মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রধান প্রজনন মৌসুম। এই সংবেদনশীল সময়ে বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার প্রতি বছরের ন্যায় চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাস সব ধরনের মাছ, কাঁকড়া আহরণ এবং পর্যটক প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।


বিজ্ঞাপন

কিন্তু সরকারি এই নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জে চলছে মৎস্য নিধন যজ্ঞ। এক শ্রেণির অসাধু শিকারি চক্র নিষিদ্ধ বিষ, পাটা জাল এবং লোহার শিক ব্যবহার করে অবাধে ধ্বংস করছে বনের জলজ সম্পদ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অসাধু জেলেরা বনের গহীনে জোয়ারের সময় খালের মুখে বিশেষ ধরনের বিষ প্রয়োগ করছে, যার প্রভাবে নদী ও খালের পানি বিষাক্ত হয়ে উঠছে এবং প্রজনন মৌসুমের কোটি কোটি পোনা মাছ, ডিম ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জলজ অমেরুদণ্ডী প্রাণী তাৎক্ষণিকভাবে মারা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি কাঁকড়া শিকারের জন্য নদীর চরে ‘আটন’ বা বিশেষ ধরনের ফাঁদ বসাতে গিয়ে শিকারিরা নির্বিচারে কেটে ফেলছে সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা, যা বনের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।


বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অবৈধ শিকারের মূল কেন্দ্রবিন্দু সুন্দরবনের সংরক্ষিত অভয়ারণ্য এলাকাগুলো, যেখানে শরণখোলা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন ভোলা নদী, বলেশ্বর নদ এবং পূর্ব সুন্দরবনের কচিখালী, সুপতী, বগী ও চরখালী ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন এলাকাগুলোতে এই অপরাধ সবচেয়ে বেশি সংঘটিত হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশ না করার সর্তে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার একাধিক জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, নিষেধাজ্ঞার এই তিন মাস তাদের মতো সাধারণ জেলেদের সংসার চালানো দায় হয়ে পড়ে, অথচ কিছু প্রভাবশালী ও অসাধু জেলে বগী, চরখালীসহ বিভিন্ন ফরেস্ট অফিসের কতিপয় দুর্নীতিবাজ লোকজনকে ম্যানেজ করে বিষ দিয়ে মাছ মারছে, যেখানে টাকা দিলে নির্বিঘ্নে মাছ শিকার করা যায় আর টাকা না দিলে সাধারণ জেলেদের মিথ্যা মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।

এই বিষয়ে পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী প্রজনন মৌসুমে বনে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন যে, কিছু জেলের গোপনে বনে প্রবেশের বিষয়টি সত্য হলেও পরিস্থিতি আগের চেয়ে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি নৌকা আটক করা হয়েছে, পাশাপাশি বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশবিদ ও বন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার অন্যতম প্রধান ঢাল এবং এই প্রজনন মৌসুমে অবৈধ মৎস্য নিধন বন্ধ করতে না পারলে বনের বাস্তুসংস্থান পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। এই সংকট উত্তরণে শরণখোলা রেঞ্জসহ ঝুঁকিপূর্ণ ফরেস্ট অফিসগুলোর নজরদারি ও ড্রোন টহল জোরদার করা, বন বিভাগের ভেতরের অসাধু চক্রকে চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা, নিষেধাজ্ঞার সময়ে কর্মহীন প্রকৃত জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত বিশেষ ভিজিএফ চাল ও বিকল্পক জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং বিষ প্রয়োগের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় সুন্দরবনের এই অপূরণীয় ক্ষতি আর কোনোভাবেই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।

👁️ 19 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *