
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান : একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুশাসন (Governance) এবং আইনের শাসন (Rule of Law) প্রতিষ্ঠার প্রধানতম ভিত্তি হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সার্বভৌমত্ব ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা।

কিন্তু সাম্প্রতিককালে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় যে নজিরবিহীন, বর্বরোচিত ও সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে, তা কেবল একটি আইন-শৃঙ্খলাজনিত সাধারণ বিচ্যুতি নয়; বরং তা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর এক চরম আঘাত। অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি একটি নৈরাজ্যবাদী প্রবণতা এবং সামাজিক চুক্তির (Social Contract) চরম লঙ্ঘন।
যদি বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নে প্রশ্ন করা হয়—জনবান্ধব ও ন্যায়নিষ্ঠ পুলিশ অফিসার মাসুদ খানের অপরাধ বা বিচ্যুতি ঠিক কোথায়? তবে অপরাধবৈজ্ঞানিক ও নৈতিক সূচকে তাঁর নিম্নলিখিত চারিত্রিক ও পেশাদার সুউচ্চ মানদণ্ডগুলোই (Professional Ethics and Standards) প্রস্ফুটিত হয় : উচ্চশিক্ষা ও তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা: তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত ও আধুনিক মনস্তত্ত্বে দীক্ষিত পুলিশ কর্মকর্তা, যা অপরাধ দমনে ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি জোগায়।

মানবিক পুলিশিং (Humanitarian Policing): সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতে তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও নাগরিক সংযোগ (Community Engagement): ক্ষমতার দম্ভ পরিহার করে তিনি একজন সদালাপী এবং জনবান্ধব সেবক হিসেবে ব্যুরোক্রেসির দূরত্ব ঘুচিয়েছেন।
সামাজিক দায়বদ্ধতা (Social Accountability): পেশাগত গণ্ডির বাইরেও আর্তমানবতার সেবায় তাঁর পরোপকারী ভূমিকা সামাজিক পুঁজিতে (Social Capital) রূপান্তরিত হয়েছে।
সততা ও প্রাতিষ্ঠানিক সততা (Institutional Integrity): দুর্নীতির করাল গ্রাসে নিমজ্জিত ব্যবস্থার বিপরীতে তিনি একজন আপসহীন, সৎ এবং অনুকরণীয় কর্মকর্তা।
অভিজাত পারিবারিক ঐতিহ্য: ঢাকার ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী ও সুখ্যাত ‘খান পরিবার’-এর সন্তান হিসেবে পারিবারিক মূল্যবোধ ও উচ্চ সামাজিক শিষ্টাচার তাঁর ব্যক্তিত্বের ভূষণ।
আদর্শিক দৃঢ়তা ও দেশপ্রেম: তিনি একনিষ্ঠভাবে জাতীয়তাবাদী দর্শনের ধারক, বাহক এবং রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও চেতনার মূর্ত প্রতীক।

ঘটনার প্রকৃত সত্য ও নৈরাজ্যবাদের নগ্ন রূপ : তদন্ত ও গণমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়, একটি চুরি ও মাদক মামলার আসামিকে (যে একজন চিহ্নিত মাদকসেবী ও চোর) নিয়মতান্ত্রিকভাবে আটক করার পর, সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার “হেফাজতে মৃত্যুর গুজব” ছড়িয়ে সমাজবিরোধী ও অপরাধী চক্রকে সংগঠিত করা হয়। এই পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক অপপ্রচারের (Propaganda and Misinformation) ওপর ভিত্তি করে কয়েকশত উগ্র লোক থানায় হানা দেয়।
এটি কোনো সাধারণ গণ-অসন্তোষ ছিল না, এটি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট “ক্রিমিনাল ব্লু-প্রিন্ট”। আক্রমণকারীরা থানায় ঢুকে ডিউটি অফিসার এএসআই আব্দুল হালিমসহ কর্তব্যরত বহু পুলিশ সদস্যকে নির্মম ও চরমভাবে রক্তাক্ত ও আহত করে। তারা থানার ভেতরে তাণ্ডব চালিয়ে দরজা-জানালা ভেঙে চুরমার করে, ল্যাপটপ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম চুরি করে এবং স্পর্শকাতর আইনি নথিপত্র ও সরকারি ফাইল তছনছ করে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তারা রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সার্বভৌমত্বের প্রতীক তথা “সরকারি অস্ত্র লুটের” এক জঘন্য অপচেষ্টা চালায়।
সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সিভিল সোসাইটির ভূমিকা : অপরাধবিজ্ঞানের পরিভাষায়, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি (OC) হলেন ওই অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় আইনের মূর্ত প্রতীক। ফলে আগৈলঝাড়া থানায় এই হামলা এবং ল্যাপটপ-অস্ত্র লুটের অপচেষ্টা মূলত ওসি জনাব মাসুদ খানের ওপর এবং প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক মেরুদণ্ডের ওপর হামলারই নামান্তর।
এখানেই মূল রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক ও নৈতিক সংকটটি দৃশ্যমান হয়—যখন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা সমাজের বিবেক বলে পরিচিত কলেজ শিক্ষকেরা থানায় নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে যাতায়াত করেন, তখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতে তাঁদের প্রতিরোধমূলক ভূমিকা (Preventive Role) অদৃশ্যই থেকে যায়। থানার পেরিফেরির (আশেপাশে) মধ্যে অবস্থানরত স্থানীয় সচেতন মহলের এই উদাসীনতা ও নীরবতা অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এক প্রকার প্রত্যক্ষ সামাজিক অপরাধ ও নাগরিক ব্যর্থতা।
অপরাধবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রানুযায়ী, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রধান স্তম্ভ তথা পুলিশের ‘জান-মাল’ এবং মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা (Psychological Security) নিশ্চিত না হলে, নাগরিকের “শান্তির ঘুম” বা সামগ্রিক মানব নিরাপত্তা (Human Security) কখনোই সম্ভব নয়। নিরাপদ পুলিশ মানেই সুরক্ষিত ও সুশাসিত সমাজ।
চূড়ান্ত আহ্বান ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব : অতএব, বরিশালের পুলিশ সুপার (এসপি), ডিআইজি এবং বিশেষ করে আইজিপি মহোদয়ের নিকট আমার বিনীত প্রাতিষ্ঠানিক অনুরোধ- এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধের শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতি অবলম্বনপূর্বক এমন এক কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতা (Accountability) নিশ্চিত করুন, যেন ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের কোনো স্থাপনা বা কর্মকর্তার ওপর হাত তোলার আগে যেকোনো দুষ্কৃতকারী চৌদ্দবার ভাবতে বাধ্য হয়। আইনের শাসন রক্ষার্থেই এই কঠোরতা কাম্য।
জাতীয়তাবাদের মহান আদর্শে উজ্জীবিত, দক্ষ ও অনন্য পেশাদার কর্মকর্তা মাসুদ খানের মতো একজন যোগ্য ব্যক্তিত্ব যেখানে দায়িত্বে নিয়োজিত, সেখানে মিথ্যা গুজবের নীল নকশা সাজিয়ে যারা এই বর্বরোচিত হামলা ও চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের অনতিবিলম্বে অপরাধ বিচার প্রক্রিয়ার (Criminal Justice System) আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।
(লেখকঃ -প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।)
