বরাদ্দ ছাড়াই সরকারি ফ্ল্যাটে দুদক কর্মকর্তার বসবাস, রাজস্ব ক্ষতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি আইন ও আদালত চট্টগ্রাম জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিনিধি (চট্টগ্রাম)  :  চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনীর সরকারি আবাসনে বরাদ্দ ছাড়াই ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক সুবেল আহমেদ—এমন অভিযোগ ঘিরে প্রশাসনিক মহলে তীব্র আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি আবাসন ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে।


বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, সিজিএস কলোনীর ‘রেনখিয়াং ডি-৯’ ভবনের ১৩-বি ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন সুবেল আহমেদ। অথচ ওই ফ্ল্যাটটি কাগজে-কলমে বরাদ্দ রয়েছে পুলিশের উপ-পরিদর্শক দীপক দেওয়ানের নামে। বদলিজনিত কারণে তিনি সেখানে ওঠেননি। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কক্সবাজার থেকে বদলি হয়ে চট্টগ্রামে যোগদানের পর দুদক কর্মকর্তা সুবেল আহমেদ “জরুরি প্রয়োজন” দেখিয়ে ওই ফ্ল্যাটে ওঠেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সূত্র বলছে, সুবেল আহমেদ দুদক আবাসন কমিটির উপ-পরিচালককে অনুরোধের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং কর্তৃপক্ষের মৌখিক অনুমতির ভিত্তিতে তিনি ফ্ল্যাটে ওঠেন। তবে আবাসন কমিটির কোনো আনুষ্ঠানিক সভায় এই বরাদ্দ অনুমোদন হয়নি বলেও জানা গেছে।


বিজ্ঞাপন

সরকারি কর্মচারীদের বাসা বরাদ্দ বিধিমালা ১৯৮২ অনুযায়ী, ষষ্ঠ গ্রেডের একজন কর্মকর্তার উচ্চমানের ভবনে আবাসনের অধিকার থাকলেও তিনি বসবাস করছেন নবম থেকে একাদশ গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত ভবনে। একই সঙ্গে বরাদ্দ না থাকায় তার বেতন থেকে কোনো আবাসন ভাড়া কর্তনও হয়নি, ফলে সরকার রাজস্ব হারিয়েছে বলে জানিয়েছে সরকারি হিসাবরক্ষণ বিভাগ।


বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, বিষয়টি সামনে আসার পর তিনি পরে চালানমূলে ভাড়া পরিশোধের কথা জানিয়েছেন।
ভবনের একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, ফ্ল্যাটে ওঠার পর থেকেই সুবেল আহমেদ ভবনের জুনিয়র কর্মকর্তাদের ওপর খবরদারি শুরু করেন এবং সামান্য বিষয়েও কঠোর আচরণ করেন। একই ভবনে বসবাসরত ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট দিন মোহাম্মদ দিনারের বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।

সার্জেন্ট দিনার জানান, একটি গাড়ি সংক্রান্ত বিষয়ে কেয়ারটেকারের মাধ্যমে যোগাযোগ করিয়ে তাকে বিষয়টি সমাধান করতে বলা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে তিনি কোনো যোগাযোগ না করলেও প্রকাশ্যে তাকে শাসানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তার স্ত্রীর গাড়ির নম্বর বিআরটিএ কার্যালয়ে পাঠানো এবং পরে সেখানে ডেকে নিয়ে জুনিয়র কর্মকর্তাদের মাধ্যমে হয়রানির অভিযোগও করেন তিনি।

সরকারি হিসাবরক্ষণ বিভাগ নিশ্চিত করেছে, বরাদ্দ না থাকায় সরকারি ফ্ল্যাট ব্যবহারের বিপরীতে কোনো ভাড়া আদায় হয়নি, ফলে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। তবে বিষয়টি সামনে আসার পর ভাড়া চালানমূলে জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম দুদকের পরিচালক আবুল হোসেন বলেন, “নিয়মানুযায়ী কোনো কর্মকর্তা বরাদ্দ ছাড়া সরকারি ফ্ল্যাটে থাকতে পারেন না। অভিযোগগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আবাসন বিভাগের উপ-পরিচালক মুনতাসির জাহান জানান, “মৌখিকভাবে থাকতে বলা হয়েছিল। তবে অনুমোদন না হলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে সুবেল আহমেদ বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে উঠেছি। ভাড়া কর্তন হয়নি ঠিকই, তবে সব টাকা চালানমূলে জমা দেব।”

জানা গেছে, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়ে। কক্সবাজার দুদক কার্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় সহকর্মীদের মানসিক হয়রানি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সরকারি পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভ্যন্তরীণ তদন্তে এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দুদক প্রধান কার্যালয়ে জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়, সুবেল আহমেদের নামে ও বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্য রয়েছে। ঢাকার খিলগাঁওয়ে নিজ নামে বাড়ি এবং ধানমন্ডিতে আত্মীয়ের নামে চার কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও উঠে এসেছে।

এছাড়া তার শিক্ষাগত জীবনের পটভূমি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা যায়, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রজীবনে তিনি আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং পরবর্তীতে ২০১৭ সালে রাজনৈতিক সুপারিশে দুদকে যোগ দেন। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই উপ-পরিচালক পদে পদোন্নতি পান বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, বরাদ্দবিহীন সরকারি আবাসন ব্যবহার, রাজস্ব ক্ষতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে দুদক কর্মকর্তা সুবেল আহমেদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছে।

👁️ 40 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *