
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান : মানব ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি ও ক্ষমতার উৎস সন্ধান করলে একটি নির্মম ও ধ্রুব সত্য উন্মোচিত হয়—মানুষের সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বা অর্থনৈতিক প্রতিপত্তিই তার প্রতি অপরের সমীহ বা আনুগত্যের প্রধান নিয়ামক।

ক্ষমতার এই গতিশীলতাকে যদি আমরা একটি রূপক অর্থে বন্য প্রকৃতির হিংস্রতম অধিপতি ‘সিংহ’ এবং তার চাটুকার ‘শিয়াল’ বাহিনীর সমীকরণের সাথে তুলনা করি, তবে সমকালীন অপরাধবিজ্ঞান ও ক্ষমতার রাজনীতির এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য উন্মোচিত হয়। প্রকৃতির এই দৃশ্যকল্প আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি মানবসমাজের এক শাশ্বত সুবিধাবাদী চরিত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
অপরাধবিজ্ঞান এবং ম্যাকিয়াভেলিয়ান ক্ষমতার তত্ত্ব (Machiavellian Theory of Power) অনুযায়ী, কর্তৃত্বের চারপাশে সবসময় একটি সুবিধাবাদী পরজীবী শ্রেণির (Parasitic Elite) জন্ম হয়। এরা কোনো আদর্শ বা নৈতিকতার টানে নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তির ‘শিকার’ বা সুযোগ-সুবিধার উচ্ছিষ্ট ভোগের আশায় চারপাশে আবর্তিত হয়।

এই পরজীবী চক্র কেবল নেতার সমস্ত কর্মকাণ্ডকেই বৈধতা দেয় না, বরং নেতার অপকর্ম ও স্বৈরাচারী আচরণকে এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক স্বীকৃতি দিয়ে তাকে আরও অন্ধ করে তোলে। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিটিও এই চাটুকারিতাকে তার প্রতি চরম ‘বিশ্বস্ততা’ ও ‘অকৃত্রিম বন্ধুত্ব’ বলে ভুল করেন। এটি ক্ষমতার মনস্তাত্ত্বিক অন্ধত্ব (Hubris Syndrome), যা শাসককে তার চারপাশের বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

তবে ক্ষমতার এই রসায়ন চিরস্থায়ী নয়। সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের চিরায়ত সত্য হলো—আনুগত্যের এই ভিত্তিটি গড়ে ওঠে সম্পূর্ণ ‘পারস্পরিক স্বার্থের’ (Utilitarianism) ওপর, কোনো আত্মিক বা নৈতিক সম্পর্কের ওপর নয়। সময়ের আবর্তে যখন সেই ক্ষমতার উৎসটি জরাজীর্ণ, অসুস্থ কিংবা দুর্বল হয়ে পড়ে—অর্থাৎ যখন ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিটি আর কোনো নতুন ‘সুবিধা’ বা ‘শিকার’ সরবরাহ করতে অসমর্থ হন—তখনই চাটুকার শ্রেণির আসল রূপ প্রকাশ পায়।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ও বিপজ্জনক অপরাধপ্রবণতাটি দেখা দেয় ঠিক এই সন্ধিক্ষণে। ক্ষমতাচ্যুত বা দুর্বল হয়ে পড়া নেতার প্রতি এই পরজীবী চক্রের তথাকথিত ‘সম্মান’ কেবল কর্পূরের মতো উড়েই যায় না, বরং তারা এক প্রকার ‘বিধ্বংসী প্রতিশোধকামী’ (Predatory Opportunism) রূপ ধারণ করে। যে শিয়াল বাহিনী একদিন সিংহের পায়ের নিচে উচ্ছিষ্টের জন্য অপেক্ষা করত, তারাই তখন সেই অসুস্থ, চলচ্ছক্তিহীন জীবিত সিংহটিকে খুবলে খেতে দ্বিধাবোধ করে না। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় ‘ক্ষমতা-শূন্যতার হিংস্রতা’ (Violence of Power Vacuum)।
এই রূপক গল্পটি আসলে আমাদের আধুনিক রাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বের এক নিখুঁত আয়না। সত্য এটাই যে, মানবসমাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো ব্যক্তির সত্তাকে নয়, বরং তার ‘শক্তি’ এবং ‘অবস্থানকে’ কুর্নিশ করে। যেদিন আপনার অবস্থান থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার উৎসটি বন্ধ হয়ে যাবে, ঠিক সেদিনই আপনার চারপাশের তথাকথিত আনুগত্য, সম্মান ও বিশ্বস্ততার দেয়ালটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
অতএব, প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, ক্ষমতার বৃত্তে থাকা ছদ্মবেশী চাটুকারিতা আর প্রকৃত আনুগত্যের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারাটাই যেকোনো নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়। মানুষের সুবিধাবাদী চরিত্রকে গভীরভাবে অনুধাবন করা এবং ক্ষমতার বসন্তে কোকিলদের চিহ্নিত করতে পারাই একজন দূরদর্শী নেতা বা শাসকের প্রধান রক্ষা কবচ। দিনশেষে, শক্তি ও সুবিধার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আনুগত্য ক্ষমতার অবসানের সাথেই চরম বিশ্বাসঘাতকতায় রূপ নেয়—এটাই প্রকৃতির এবং মানব সভ্যতার সবচেয়ে নির্মম রাজনৈতিক সত্য।
(লেখকঃ – প্রফেসর ড. আসিফ মিজান উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।)
