গণপূর্তের গোপন আঁধার  :  ১৫টি চেক জালিয়াতি, বিপুল অর্থ আত্মসাৎ! পূবালী ব্যাংক বিপাকে, নীরব নির্বাহী প্রকৌশলী  !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত গ্রাম বাংলার খবর জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

বিশেষ  প্রতিবেদক  :  নোয়াখালী পিডব্লিউডি-তে ভয়াবহ দুর্নীতির ক্যানভাস: কোটি টাকার খেলা শুরু  ! নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগ (PWD) এখন এক ভয়ংকর আর্থিক কেলেঙ্কারির রঙ্গমঞ্চ! সরকারি অর্থের নিয়ন্ত্রিত লুণ্ঠন চলছে নির্বাহী প্রকৌশলীর নাকের ডগায়। অনুসন্ধানে যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা কেবল ভয়াবহ অনিয়ম নয় এ যেন সরকারি অর্থ কোষাগার থেকে পরিকল্পিত ডাকাতি! মূল হোতারা হলেন: বিভাগীয় হিসাবরক্ষক মো. ইমরান হোসেন এবং ক্যাশিয়ার। তাদের অন্ধকার আঁতাত নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলামের চোখে ধুলো দিয়ে ১৫টি চেক ভিন্ন অ্যাকাউন্টে নগদায়ন করে বিশাল অঙ্কের সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছে।


বিজ্ঞাপন

ব্যাংকের ‘নিশ্চয়তা’র জাল  : ফাঁদে পূবালী ব্যাংক, দত্তেরহাট শাখা  হাতিয়া মডেল মসজিদ নির্মাণ কাজের ঠিকাদার KE-OG-DESH (JV) এর কর্ণধার মোঃ ওসমান গণি এই প্রজেক্টের বিপরীতে পূবালী ব্যাংক, দত্তেরহাট শাখা থেকে ঋণ নেন। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি প্রকল্পের ঋণের জন্য PWD বিল পরিশোধের লিখিত নিশ্চয়তা প্রদান করে।

বিগত ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে PWD লিখিতভাবে ব্যাংককে জানায়, কাজের বিলের সকল চেক কেবল মাত্র ব্যাংকের লোনের অনুকূলে নির্দিষ্ট হিসাব নম্বর ০৫১২-৯০১-০৩৫৩৮৭ বরাবর ইস্যু করা হবে। এই ‘নিশ্চয়তা’র ভিত্তিতে ব্যাংক ঠিকাদারের অনুকূলে ৭৪ লক্ষ ৬৪ হাজার টাকা গ্যারান্টি এবং ৩.০০ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করে। অথচ, এই লিখিত শর্তকেই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুরু হয় জালিয়াতি! এটাই ছিল এই জালিয়াতির মূল চাবিকাঠি: চেকের গায়ে নির্ধারিত লোন অ্যাকাউন্টের নম্বর লেখা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেই নিয়মকে পদদলিত করা হয়!


বিজ্ঞাপন

অসংগতির বিস্ফোরণ: ক্ষমা চেয়েও রক্ষা নেই  !১৪-০৮-২০২৪ তারিখে পূবালী ব্যাংক, দত্তেরহাট ব্রাঞ্চ PWD-কে চিঠি দিয়ে ঋণের মেয়াদ নবায়ন সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইলে ভয়াবহ আর্থিক অসংগতির কঙ্কাল বেরিয়ে আসে। দেখা যায়, সে সময় পর্যন্ত ইস্যুকৃত ১৩টি চেকের মধ্যে মাত্র ৮টি চেক লোন অ্যাকাউন্টে ইস্যু হয়েছে। মাঝের ৫টি চেক উধাও !


বিজ্ঞাপন

বিভাগীয় হিসাবরক্ষক মো. ইমরান হোসেন তড়িঘড়ি ব্যাংকে গিয়ে ম্যানেজারের পায়ে ধরে ক্ষমা চান, চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার সেই প্রচেষ্টা ছিল কেবলই নাটকের প্রথম অঙ্ক। এরপরেই তিনি আরও ১০টি চেক ইস্যু করেন, যার মধ্যে একটিও ব্যাংকের লোন অ্যাকাউন্টে ইস্যু করেননি! মোট ২৩টি চেকের মধ্যে লোন অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে মাত্র ৮টি চেক, যার মূল্য ৩৬,৬৯,৮০৮০.০০ টাকা। বাকি ১৫টি চেক জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভিন্ন অ্যাকাউন্টে নগদায়ন করা হয়েছে!

এই বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারির ফলে পূবালী ব্যাংকের দত্তেরহাট শাখার অনাদায়ী লোনের পরিমাণ এখন ১,৯৫,৭৫,৯১১.৬৫ টাকা। সরকারি অফিসের এই নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা ব্যাংককে প্রায় ২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মুখে ঠেলে দিয়েছে!

ক্ষমতার ছায়া : ওবায়দুল কাদেরের তদবির! নীরব কামরুল ইসলাম এই ভয়াবহ জালিয়াতির পেছনে রয়েছে হিসাবরক্ষক মো. ইমরান হোসেন এবং ক্যাশিয়ারের সঙ্গে স্থানীয় ঠিকাদারের অন্ধকার আঁতাত। স্থানীয় সূত্রে খবর, ইমরান হোসেনের বাড়ি নোয়াখালী হওয়ায় এবং ২৭ জুলাই ২০২২ সালে ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের তদবিরে নিজ জেলায় পদায়ন নিশ্চিত করায় তার ক্ষমতার দাপট প্রবল। একই কর্মস্থলে সাড়ে তিন বছর এবং তার আগে হিসাব সহকারী পদে দীর্ঘদিন চাকুরী করায় স্থানীয় ঠিকাদারদের সাথে তার গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম এই সমস্ত জেনেশুনেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সাহস পাচ্ছেন না! তার এই রহস্যজনক নীরবতা কি কেবলই স্থানীয় প্রভাবের কাছে আত্মসমর্পণ, নাকি তিনিও এই গোপন আঁতাতের অংশ? প্রশ্নের মুখে তার প্রশাসনিক সততা ও তদারকির ভূমিকা।

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাছান কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি হিসাবরক্ষক মো. ইমরান হোসেন এবং ক্যাশিয়ারকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে বলেন। তিনি বলেন নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগ এর বিভিন্ন কাজের বিপরীতে ঠিকাদারের লোন আছে। চেক রেডি করা তাদের দায়িত্ত। তারা বলে স্যার আপনি চেকটা সই করে দেন। আমি রেজিস্টার দেখে চেকের গায়ে একাউন্টের নাম লিখে দিবো। এরপর তারা সেটা না লিখে চেকটি ঠিকাদারের কাছে হস্তান্তর করলে আমার পক্ষে সেটা জানা সম্ভব না।

উঠেছে প্রশাসনিক ঝড়  : এই অনিয়মের দায় কার?  এই ঘটনায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে, যা এই দুর্নীতির শেকড় উন্মোচন করতে পারে: লিখিত নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ১৫টি চেক কীভাবে ভিন্ন অ্যাকাউন্টে নগদায়ন হলো? পূবালী ব্যাংক নির্ধারিত লোন অ্যাকাউন্ট ছাড়া চেক এনক্যাশ করতে দিল কেন? গণপূর্ত বিভাগের অভ্যন্তরীণ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কোথায় ছিল? এই বিপুল অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় নির্বাহী প্রকৌশলীর নীরবতার কারণ কী? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিষয়টি দ্রুত দুদক (দূর্ণীতি দমন কমিশন) ও মন্ত্রণালয় পর্যায়ের উচ্চতর তদন্ত না হলে সরকারি অর্থ আত্মসাতের এমন জঘন্য নজির ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। কোটি টাকার এই দুর্নীতি প্রমাণ করে, ক্ষমতার জোরে কীভাবে সরকারি কোষাগারকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করা যায়!

👁️ 196 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *