উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষের অদৃশ্য সাম্রাজ্য : দুদকের অভিযান কি লোক দেখানো? প্রশ্নের মুখে সাব-রেজিস্ট্রার মোরশেদ আলম !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত চট্টগ্রাম জাতীয় প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিনিধি ((কক্সবাজার) :  কক্সবাজারের উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস—নামেই সরকারি সেবা কেন্দ্র, বাস্তবে সাধারণ মানুষের জন্য যেন এক ভয়ংকর দালালনির্ভর ঘুষের আখড়া। জমি নিবন্ধনের মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সেবা নিতে এসে বছরের পর বছর ধরে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের কাছে বিষয়টি এখন আর গোপন নয়—এ যেন এক ‘প্রকাশ্য গোপন সত্য’।


বিজ্ঞাপন

ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, দালাল ছাড়া ঢোকাই দায় : অভিযোগ রয়েছে, অফিসটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও সাধারণ নাগরিকদের সরাসরি প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অফিসের সামনে ঝুলছে ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’ সাইনবোর্ড। বাস্তবে এর অর্থ একটাই—দালাল ছাড়া ভেতরে ঢোকার উপায় নেই।

ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হচ্ছেন সিন্ডিকেটের শরণাপন্ন হতে। উখিয়া সদর এলাকার এক ভুক্তভোগী জানান, সরকারি সব ফি পরিশোধের পরও দিনের পর দিন ঘুরতে হয়েছে তাকে। একপর্যায়ে তাকে স্পষ্ট করে বলা হয়—“ম্যানেজ না করলে দলিল নামবে না।” এই অভিজ্ঞতা একক নয়; একই অভিযোগ করেছেন বহু সেবাগ্রহীতা।


বিজ্ঞাপন

বেবী রাণী–সৃদুল–রবিকে ঘিরে শক্ত সিন্ডিকেট : স্থানীয় দলিল লেখক ও একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের মতে, অফিস সহকারী বেবী রাণী দে এই অনিয়মের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তার সঙ্গে মোহরার সৃদুল দাশ ও কর্মচারী রবিউল্লাহ রবি মিলে গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা পুরো অফিসের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।


বিজ্ঞাপন

এক কোটির জমিতে অতিরিক্ত ৫০ হাজার ! অভিযোগ আরও ভয়াবহ। সরকারি ফি’র বাইরে জমির ঘোষিত মূল্যের প্রায় ০.৫ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। অর্থাৎ এক কোটি টাকার জমি নিবন্ধনে দিতে হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঘুষ। এই টাকা সরাসরি নেওয়া হয় না—দলিল লেখকদের মাধ্যমে আদায় করা হয়, যাতে লেনদেন থাকে আড়ালে।

দুদকের অভিযান : আগাম খবর, সরানো হয় টাকা ? গত বছরের ১৬ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি এনফোর্সমেন্ট টিম উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অভিযান চালায়। অভিযানে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সেবা দিতে গড়িমসি এবং অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

তবে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো—দুদকের অভিযানের খবর আগেই পেয়ে যান সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মোরশেদ আলম। সেদিন তিনি অস্বাভাবিকভাবে খুব সকালে অফিসে উপস্থিত হন এবং অফিসে থাকা প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয়—এমন অভিযোগ করেছেন অফিসেরই এক কর্মচারী।

দুদক যা বলেছে : দুদকের জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক গোলসান আনোয়ার অভিযান শেষে জানান, ছদ্মবেশে গিয়ে দলিল নিবন্ধনের খরচ, পদ্ধতি এবং সেবাগ্রহীতাদের অভিজ্ঞতা যাচাই করা হয়। সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে হয়রানি ও অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের সত্যতা পাওয়া গেছে বলেও তিনি স্বীকার করেন। তবু প্রশ্ন—শাস্তি কোথায়? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এত কিছুর পরও কেন দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই? স্থানীয়দের ধারণা, দুদকের এই অভিযান কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল?

সাব-রেজিস্ট্রার মোরশেদ আলম : অভিযোগের কেন্দ্রে
সব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মোরশেদ আলম। স্থানীয়দের দাবি, পতিত সরকার আমল থেকেই তিনি একই অফিসে বহাল রয়েছেন। একাধিকবার অভিযোগ উঠলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একজন প্রবীণ দলিল লেখকের ভাষায়, “একই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন থাকলে সেখানে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠাই স্বাভাবিক। উখিয়ায় যা হয়েছে, তা একদিনে নয়—বছরের পর বছর ধরে।”

রাজস্ব ফাঁকি ও ভয়ংকর অভিযোগ : ঘুষের পাশাপাশি রয়েছে আরও মারাত্মক অভিযোগ— জমির শ্রেণি পরিবর্তন, প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি, এসব অনিয়মে অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ অস্বীকার, সন্দেহ থেকেই যায় : অভিযুক্ত অফিস সহকারী বেবী রাণী দে ও মোহরার সৃদুল দাশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রবিউল্লাহ রবি মন্তব্য করতে রাজি হননি। সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মোরশেদ আলম সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, অফিসে প্রবেশে কোনো বাধা নেই এবং সব কার্যক্রম সিসিটিভির আওতায়।

শেষ কথা: শুধু অভিযান নয়, চাই জবাবদিহি : স্থানীয়দের দাবি স্পষ্ট—শুধু অভিযান নয়, চাই প্রশাসনিক জবাবদিহি। তারা দ্রুত স্বাধীন তদন্ত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

প্রশ্ন এখন একটাই—দুদক কি এবার সত্যিকারের ব্যবস্থা নেবে, নাকি উখিয়ার মানুষকে আবারও অপেক্ষার তালিকায় রেখে দেবে?

👁️ 41 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *