
নিজস্ব প্রতিনিধি (কক্সবাজার) : দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ, বিতর্ক ও গোপন প্রভাবের আড়ালে থাকা কক্সবাজার জেলা গণপূর্ত বিভাগের প্রভাবশালী ঠিকাদার জালাল উদ্দীন অবশেষে আইনের জালে ধরা পড়েছেন। চেক জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করেছে কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ।

গতকাল বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাতে শহরের বাহারছড়া এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। পুলিশ নিশ্চিত করেছে—তার বিরুদ্ধে আগেই আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ছিল।
গ্রেফতার জালাল উদ্দীন বাহারছড়ার বাসিন্দা ও সালেহ আহমদের ছেলে। শুধু একজন ঠিকাদার নন—তিনি ছিলেন গণপূর্ত ঠিকাদার কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি, যে পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম, আর্থিক কারসাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত ছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
পুলিশ সূত্র জানায়, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (এনআই) অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দায়ের করা সিআর ৪৭১/২৫ নম্বর মামলায় জালাল উদ্দীন প্রধান আসামি। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি চেক প্রদান করে ইচ্ছাকৃতভাবে পর্যাপ্ত অর্থ না রেখে অথবা চেক বাতিল করে প্রতারণামূলকভাবে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। এই কৌশলে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছমি উদ্দিন গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “আদালতের পরোয়ানার ভিত্তিতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার তদন্তে আর্থিক জালিয়াতির একাধিক তথ্য পাওয়া গেছে।”
তবে চেক জালিয়াতির মামলা জালাল উদ্দীনের বিতর্কিত অধ্যায়ের মাত্র একটি অংশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নেওয়া এবং অবৈধ সুবিধা আদায়ের অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গণপূর্ত বিভাগের কাজ পেতে তিনি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া ব্যবহার করতেন।
প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে কাজ নেওয়া, নিম্নমানের নির্মাণকাজ করে বিল উত্তোলন এবং ভিন্নমত পোষণকারী ঠিকাদারদের চাপের মুখে রাখাই ছিল তার কৌশল। এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় একাধিকবার অসন্তোষ তৈরি হলেও রহস্যজনক কারণে তা দীর্ঘদিন আলোর মুখ দেখেনি।
অনুসন্ধানী সূত্র বলছে, জালাল উদ্দীনের প্রভাব এতটাই ছিল যে অনেক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি। ফলে একের পর এক অভিযোগ চাপা পড়ে গেছে—যার সুযোগে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
যদিও এসব অতিরিক্ত অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল, তবে চেক জালিয়াতির মামলায় গ্রেফতার হওয়ায় জালাল উদ্দীনের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন—এতদিন তাকে রক্ষা করছিল কারা?
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। মামলার নথিপত্র গভীরভাবে যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে কক্সবাজারের গণপূর্ত বিভাগের ঠিকাদারি ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, প্রভাব খাটানো ও আর্থিক অনিয়মের অন্ধকার অধ্যায় উন্মোচিত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন দেখার বিষয়—এই একটি গ্রেফতার কি শুধু “চুনোপুঁটি”তেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর সূত্র ধরে বেরিয়ে আসবে পুরো দুর্নীতির চক্র?
