
নিজস্ব প্রতিবেদক (খুলনা) : খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১—একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর, যেখানে উন্নয়ন, অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষার দায়িত্ব থাকার কথা। অথচ এই দপ্তরকে ঘিরেই দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল ইসলাম। স্থানীয় ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং সচেতন নাগরিকদের ভাষ্যে, এসব অভিযোগ নতুন নয়—বরং সময়ের সঙ্গে আরও গভীর ও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গোপালগঞ্জ থেকে খুলনায় বদলি হয়ে আসার পর থেকেই কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে—এমনটাই দাবি স্থানীয় মহলের। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে তাকে একজন প্রভাবশালী ও বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি সম্পদ বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর আওতাধীন সিএন্ডবি কলোনি ও জোড়া গেট এলাকার সরকারি ভবন বিক্রির নিলাম প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর-২০০৮) যথাযথভাবে অনুসরণ না করে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা হয়। এ ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলীর ভূমিকা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।

গোপালগঞ্জের ছায়া খুলনাতেও ? সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পূর্ববর্তী কর্মস্থল গোপালগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে একটি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরদারিতেও আসে বলে দাবি করা হয়। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে সেই অভিযোগের কার্যকর তদন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি—এমন অভিযোগও রয়েছে।

স্বজনপ্রীতি ও ‘হিডেন টেন্ডার’-এর অভিযোগ : মো. কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আত্মীয়-স্বজনদের নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স বের করে কাজ বণ্টন এবং তথাকথিত ‘হিডেন টেন্ডার’ বা গোপন দরপত্রের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন একাধিক ঠিকাদার। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিতভাবে কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ঘুষ ছাড়া নড়ে না ফাইল—এমন দাবি : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার ও কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুমোদন, দরপত্র ছাড়, টিইসি রিপোর্ট কিংবা বিল সংক্রান্ত কার্যক্রমে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন ছাড়া অগ্রগতি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল আটকে রাখা, অযৌক্তিক জটিলতা সৃষ্টি এবং মানসিক চাপ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ক্ষমতার পালাবদলেও প্রভাব অটুট ? সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বিগত সরকারের সময় তিনি একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেকে ভিন্ন রাজনৈতিক ঘরানার সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে উপস্থাপন করে নতুনভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে।
জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবতা কোথায় ? সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বারবার উচ্চারণ করলেও খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর এই নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকায় প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, অভিযোগগুলো যতই গুরুতর হোক না কেন—নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ছাড়া সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব নয়।
এখন প্রশ্ন একটাই— এই অভিযোগগুলো কি আদৌ তদন্তের মুখ দেখবে, নাকি প্রভাবের বলয়ে চাপা পড়েই থেকে যাবে?
