
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রভাবশালী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম।

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প মানেই যেন দুর্নীতির আরেকটি নতুন অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের অন্যতম আলোচিত নাম—গণপূর্ত অধিদপ্তর। একের পর এক প্রকল্প, হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ, অথচ সাধারণ মানুষের প্রাপ্তি প্রশ্নবিদ্ধ। এই চিত্রের ভয়াবহ প্রতিফলন কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগে, যেখানে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
সরকারি চাকরির সীমিত বেতন কাঠামোর আড়ালে কীভাবে একজন প্রকৌশলী খুলনার জোড়াকল বাজার এলাকায় বহুতল ভবনের মালিক হন—সে প্রশ্ন এখন কেবল কুষ্টিয়ার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; ঢাকার প্রশাসনিক অন্দরমহলেও বিষয়টি ‘নীরব আলোচনার’ কেন্দ্রে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ার সুযোগ নিয়ে জাহিদুল ইসলাম গড়ে তুলেছিলেন একটি শক্তিশালী দুর্নীতির বলয়।

মেডিকেল কলেজ প্রকল্প: উন্নয়নের নামে পরিকল্পিত লুটপাট ? সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্প। অনুসন্ধানে উঠে আসে, এখানে অনিয়ম ছিল কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—বরং এটি ছিল সুপরিকল্পিত ও ধারাবাহিক লুটপাটের রূপরেখা।

অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মাহবুব উল আলম হানিফের ঘনিষ্ঠতা ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয় একটি টেন্ডার সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম অংশ হিসেবে স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা ও নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলামের নাম বারবার উঠে এসেছে। টেন্ডার বণ্টনের নামে সরকারকে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
সর্বনিম্ন দরদাতা বঞ্চিত, পছন্দের ঠিকাদারই জয়ী : দরপত্রের নথি বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে আরও ভয়ংকর চিত্র। একাডেমিক ভবনের লিফট, হাসপাতালের ওটি, আইসিইউ ও সিসিইউ ভবনের লিফটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে বারবার সর্বনিম্ন দরদাতাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে ৩–৪ মাস পর্যন্ত দরপত্র নিষ্পত্তি ঝুলিয়ে রাখা হতো, যেন ‘কমিশন’ ছাড়া কোনো ফাইল এগোয় না।
এভাবে সুপারস্টার ইঞ্জিনিয়ারিং, ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ারিংসহ সিন্ডিকেটভুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানকে বারবার বেশি দামে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। প্রকৃত যোগ্য ও সর্বনিম্ন দরদাতারা অভিযোগ করেও ন্যায্যতা পাননি বলে দাবি করেছেন।
একই কৌশলে একের পর এক প্রকল্প : এই অনিয়ম শুধু একটি প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সড়ক, ড্রেন, পুকুরসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক কাজেও একই ছক অনুসরণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, মেসার্স শামীম এন্টারপ্রাইজ সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও কাজ না পেয়ে গ্যালাক্সি অ্যাসোসিয়েটসের মতো প্রতিষ্ঠান অযৌক্তিকভাবে কাজ পায়, যাদের হাতে তখনই প্রায় ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান ছিল।
কুষ্টিয়ার নতুন সার্কিট হাউস, মডেল মসজিদসহ একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পেও একই কৌশলে লুটপাটের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয় বলে অভিযোগ। এসব বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
একই স্থানে বারবার টেন্ডার, একই বছরে একাধিক বিল !
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলোর একটি হলো—কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের অভ্যন্তরে ৪০ বছর পুরনো এক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর সরকারি বাসভবন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ভবনের কাঠামো পরিবর্তনের নামে নামে-বেনামে দরপত্র আহ্বান করে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়। একই স্থানে একই বছরের জুন মাসেই একাধিকবার ‘মেরামত’ দেখিয়ে নতুন নতুন টেন্ডার ডেকে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
এমনকি ডিসি অফিসের বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণেও একই অর্থবছরে বারবার টেন্ডার আহ্বান করে বিল তোলার নাটক সাজানো হয়। সদর হাসপাতাল, জজ কোর্ট, ডিসি অফিসসহ জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এভাবে ‘ওভারল্যাপিং’ প্রকল্প দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
নীরবতা কি দায়মুক্তির ইঙ্গিত ? এত গুরুতর অভিযোগ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো তদন্ত বা দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—এই নীরবতা কি কেবল প্রশাসনিক গাফিলতি, নাকি আরও গভীর কোনো সমীকরণ?
এ বিষয়ে প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতির এই অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত না হলে কুষ্টিয়ার উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যে জনগণের আস্থাহীনতার প্রতীক হয়ে থাকবে—সে আশঙ্কাই এখন জোরালো হচ্ছে।
