
জামালপুর প্রতিনিধি : গ্যাসের চাপ স্বল্পতায় আবারও থমকে গেল দেশের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল)। বৃহস্পতিবার দুপুরে গ্যাসের চাপ ৮ কেজির নিচে নেমে যাওয়ায় কারখানার বুস্টার ট্রিপ করে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। নিয়মিত উৎপাদন ধরে রাখতে যেখানে ১০ কেজি চাপের গ্যাস অপরিহার্য, সেখানে প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় কর্তৃপক্ষকে বাধ্য হয়ে উৎপাদন ইউনিট বন্ধ রাখতে হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কারখানার জিএম (অপারেশন) মো. ফজলুল হক।

গ্যাসচাপের এই সংকট এখন আর নিছক একটি কারিগরি সমস্যা নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি রূপ নিচ্ছে চুক্তি লঙ্ঘন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় ক্ষতির অভিযোগে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তায় তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শিল্প খাতে প্রচলিত মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ দামে গ্যাস কিনছে যমুনা সার কারখানা অথচ বাস্তবে চুক্তিবদ্ধ গ্যাসের নির্ধারিত চাপ নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
কারখানা ও জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিতাসের সঙ্গে করা চুক্তিতে নির্দিষ্ট চাপ বজায় রেখে ধারাবাহিক গ্যাস সরবরাহের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু দিনের বিভিন্ন সময়ে হঠাৎ করেই গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে। এতে উৎপাদন ইউনিটগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফল হিসেবে দৈনিক ইউরিয়া উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় এক হাজার মেট্রিক টনে, যেখানে কারখানার সক্ষমতা এক হাজার সাত শ’ মেট্রিক টন।

জিএম (অপারেশন) ফজলুল হক বলেন, ‘আমরা দ্বিগুণ দামে গ্যাস কিনছি শুধু একটি কারণে—কারখানার উৎপাদন যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে চুক্তি অনুযায়ী গ্যাসের চাপ সরবরাহ করা হচ্ছে না। এতে রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ক্ষতির মুখে পড়ছে।’

কারখানা সূত্র জানায়, কেপিআই-১ ইউনিটে স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখতে নির্ধারিত মাত্রার গ্যাসচাপ নিশ্চিত করা গেলে দৈনিক প্রায় এক হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন সম্ভব। বর্তমানে চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন সীমিত রাখতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন গড়ে ৬ শ’ থেকে ৭ শ’ মেট্রিক টন সার উৎপাদন হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এর আর্থিক ক্ষতি প্রতিদিনই কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
গ্যাসের সংকটে শুধু উৎপাদন ঘাটতিই নয়, বাড়ছে কারিগরি ঝুঁকিও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসচাপের ওঠানামা শিল্পকারখানার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। বারবার উৎপাদন কমানো ও বাড়ানোর ফলে যন্ত্রপাতির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। কারখানার একাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহ ভবিষ্যতে বড় ধরনের যান্ত্রিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় সার সরবরাহ ব্যবস্থাতেও। যমুনা সার কারখানা দেশের ইউরিয়া উৎপাদনের একটি বড় অংশ জোগান দেয়। এখানকার উৎপাদন কমে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষি খাতে।
কৃষি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সামনে বোরো মৌসুমকে কেন্দ্র করে ইউরিয়া সারের চাহিদা বাড়বে। এই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোর পূর্ণ উৎপাদন নিশ্চিত না হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যার সুযোগ নিতে পারে কালোবাজারি চক্র।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি খাত বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি কারখানার সমস্যা নয়; বরং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বড় প্রশ্ন। এক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘দ্বিগুণ দাম দিয়েও যদি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস না পায়, তাহলে সাধারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা সহজেই অনুমেয়।’
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে রাষ্ট্র হারাবে বিপুল উৎপাদন আয়, বাড়বে সার আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
এদিকে জামালপুর জেলা বিএফএ’র সাবেক সভাপতি চান মিয়া চানু বলেন, ‘লাভজনক এই কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে গ্যাসচাপ সংকটের নামে যদি ভানুমতির খেলা বন্ধ না করা হয়, তাহলে এলাকার সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’
সব মিলিয়ে, যমুনা সার কারখানার গ্যাসচাপ সংকট এখন জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়ন ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে এর প্রভাব শুধু একটি কারখানায় নয়, দেশের কৃষি ও অর্থনীতিতেও গভীর ছাপ ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।
