
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের সংবিধান এবং সুপ্রিম কোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ২০ জন প্রার্থীকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শুধুমাত্র “নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন দাখিল” করা হয়েছে—এই যুক্তিতে প্রার্থিতা বৈধ করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গুরুতর সাংবিধানিক বিতর্ক ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ।

সংবিধানের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(গ) ও ৬৬(২ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী: কোনো বিদেশী নাগরিক বা দ্বৈত নাগরিক ব্যক্তি বিদেশী নাগরিকত্ব আইনগতভাবে ত্যাগ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার যোগ্য নন। অর্থাৎ শুধু আবেদন করলেই বিদেশী নাগরিকত্ব বাতিল হয় না—আইনগতভাবে অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশী নাগরিক হিসেবেই গণ্য থাকবেন।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রিট পিটিশন নং ১৬৪৬৩/২০২৩ মামলার রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: “নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশী নাগরিক হিসেবেই বিবেচিত থাকবেন; কেবল আবেদন করাই নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য যথেষ্ট নয়।” এই আদেশ বর্তমানে আপিল বিভাগেও বহাল রয়েছে।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে—এই নির্দেশনার পরও নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র আবেদন জমা দেওয়ার ভিত্তিতে প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছে।

যেসব দ্বৈত নাগরিক প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে : আইন ও আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে বৈধ ঘোষণা পাওয়া প্রার্থীদের তালিকা যথাক্রমে তুলে ধরা হলো, আব্দুল আওয়াল মিন্টু – বিএনপি (ফেনী-৩), আফরোজা খানম – বিএনপি (মানিকগঞ্জ-৩), এ কে এম কমরুজ্জামান – বিএনপি (দিনাজপুর-৫), শামা ওবায়েদ – বিএনপি (ফরিদপুর-২), শওকাতুল ইসলাম – বিএনপি (মৌলভীবাজার-২), মুশফিকুর রহমান – বিএনপি (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-৪), ফাহিম চৌধুরী – বিএনপি (শেরপুর-২), নাজরুল ইসলাম – জামায়াতে ইসলামী (ঢাকা-১), জুনায়েদ হাসান – জামায়াতে ইসলামী (ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-৩), এ কে এম ফজলুল হক – জামায়াতে ইসলামী (চট্টগ্রাম-৯), মহবুবুল আলম – জামায়াতে ইসলামী (কুড়িগ্রাম-৩), এহতেশামুল হক – জাতীয় নাগরিক পার্টি (সিলেট-১), অনোয়ার হোসেন – স্বতন্ত্র প্রার্থী (সুনামগঞ্জ-৩), সুজাত মিয়া – স্বতন্ত্র প্রার্থী (হবিগঞ্জ-১), জহিরুল ইসলাম – ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (নোয়াখালী-১), Moniruzzaman – বিএনপি (Satkhira-4), Tahir Raihan – বিএনপি (Sunamganj-2), Md Manjum Ali – জাতীয় পার্টি (Rangpur-1), Khorshed Alam – জামায়াত-e-Islami (Chapainawabganj-1) এবং Azadul Haque – খেলাফত মজলিস (Natore-1)

আইনজ্ঞদের শঙ্কা: সাংবিধানিক বৈধতা প্রশ্নের মুখে : সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আদালতের নির্দেশ অমান্য করে প্রার্থিতা বৈধ করা হয়, তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে, পরবর্তীতে সংসদের বৈধতা নিয়েও মামলা হতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সাংবিধানিক সংঘাত তৈরি হতে পারে।
এক জ্যেষ্ঠ আইনবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন: “নির্বাচন কমিশন আদালতের রায় মানতে বাধ্য। যদি না মানে, তাহলে এটি সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।”
নীরব নির্বাচন কমিশন : এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি। তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, “রাজনৈতিক চাপ ও বাস্তবতার” অজুহাতে আবেদনপত্রকেই যথেষ্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
গুরুতর প্রশ্ন : আদালতের নির্দেশ অমান্য করার ক্ষমতা কি নির্বাচন কমিশনের আছে ? দ্বৈত নাগরিক প্রার্থীরা কি এখনো আইনগতভাবে বিদেশী নাগরিক নন ? ভবিষ্যতে এই প্রার্থীরা জয়ী হলে সংসদের বৈধতা কি প্রশ্নবিদ্ধ হবে?
শেষ কথা : সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। সুপ্রিম কোর্ট তার ব্যাখ্যাকারী সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যখন সেই সংবিধান ও আদালতের নির্দেশ পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—তখন প্রশ্ন উঠে যায়: এই নির্বাচন কি সত্যিই সংবিধানের আলোকে পরিচালিত হচ্ছে ? নাকি তৈরি হচ্ছে নতুন এক সাংবিধানিক সংকট ?
