বিআইডব্লিউটিএতে ‘সিবিএ সন্ত্রাস’  ! কর্মচারী নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগে তোলপাড় ! 

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সংগঠন সংবাদ সারাদেশ

বিআইডব্লিউটিএ’র (সিবিএ) ‘ভারপ্রাপ্ত সভাপতি’ দাবি করা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী মাজহারুল ইসলাম।


বিজ্ঞাপন

 

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ—বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এ আবারও সামনে এসেছে শ্রমিক রাজনীতির আড়ালে ভয়ঙ্কর দখল, নির্যাতন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ।


বিজ্ঞাপন

সংস্থাটির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) ‘ভারপ্রাপ্ত সভাপতি’ দাবি করা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে—অপছন্দ হলেই কর্মচারীদের মারধর, চাঁদাবাজি, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পুলিশে সোপর্দ, বদলির ভয় দেখানো এবং সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের হুমকি-ধমকি দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি।

বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে সুবিধাভোগী একটি চক্রের অংশ হিসেবে পরিচিত মাজহারুল ইসলাম সরকার পরিবর্তনের পরও প্রভাব ধরে রাখতে রাজনৈতিক পরিচয়ের রঙ বদলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, আগে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে দাপট দেখানো এই চক্র এখন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার বাণিজ্য ও দখলবাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছে।

মারধর, ছিনতাই, তারপর পুলিশে সোপর্দ ! মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সর্বশেষ গুরুতর অভিযোগ ওঠে বিআইডব্লিউটিএর হিসাব বিভাগের অফিস সহায়ক ইসরারুল হাসান সুমনের ওপর হামলার ঘটনায়।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৩ এপ্রিল রাজধানীর মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএ প্রধান কার্যালয়ের সামনে ১০-১২ জন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে সুমনের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় তাঁকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি তাঁর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

পরে সুমনকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। যদিও বিএনপির এক প্রভাবশালী এমপির হস্তক্ষেপে তিনি ছাড়া পান। তবে এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ঘটনার পরপরই সুমনকে বিআইডব্লিউটিএ সিবিএ ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের পদ থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, ঘটনাটি ঘটার পর কৌশলে পেছনের তারিখ ব্যবহার করে বহিষ্কারের চিঠি ইস্যু করা হয়েছে।

৫ আগস্ট’ থেকেই দখল রাজনীতি  :  সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দিনই মাজহারুল ইসলাম তাঁর সহযোগীদের নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ ভবনের তালা ভেঙে নিচতলার সিবিএ কার্যালয় দখল করেন। এরপর নিজেকে সংগঠনের ‘ভারপ্রাপ্ত সভাপতি’ ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে রাতারাতি বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক দলের ‘সভাপতি’ পরিচয় ব্যবহার শুরু করেন।

অতিরিক্ত ডিআইজি সাবেক শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ফারুককে ফুল দিচ্ছে বিতর্কিত মাজাহার ইসলাম।

 

অভিযোগ রয়েছে,  সংস্থার প্রভাবশালী কয়েক কর্মকর্তার সহায়তায় তিনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন। এরপর থেকেই শুরু হয় বদলি বাণিজ্য, নিয়োগ সিন্ডিকেট, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব বিস্তারের রাজত্ব।

বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মচারীর দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে চক্রটি।

চাঁদা না দেওয়ায় নির্যাতনের অভিযোগ  :  শুধু সুমন নন, এর আগে গত ১৩ এপ্রিল সংস্থার লিফট অপারেটর মিজানুর রহমানকেও সিবিএ কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, চাঁদার টাকা না দেওয়ায় তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।

এই ঘটনায় মিজানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মাজহারের সহযোগী ও বিআইডব্লিউটিএর গেজপাঠক পদে কর্মরত শফিকুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গত দুই বছরে আজিজুল ইসলাম, মজিবুর রহমান, নুরুল আলম, আক্কাস হোসেনসহ আরও অনেক কর্মচারী এই চক্রের নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেককে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ তকমা দিয়ে পুলিশে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিককে হুমকি  :  মাজহারুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে গত ২৪ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে “নব্য শ্রমিক দল নেতাদের দাপটে অসহায় কর্মচারীরা” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম কর্মীকে ফোন করে হুমকি দেন মাজহার। নির্যাতনের শিকার কর্মচারীদের ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তাদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি।

একপর্যায়ে সাংবাদিককে “দেখে নেওয়া” এবং মামলা দিয়ে শায়েস্তা করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কথোপকথনের একপর্যায়ে গালাগাল করে ফোন কেটে দেন তিনি।

গণমাধ্যমকর্মীদের একটি অংশ বলছেন, এটি শুধু একজন সাংবাদিককে হুমকি নয়; বরং সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে ভয়ভীতি প্রদর্শনের একটি সুস্পষ্ট অপচেষ্টা।

অভিযোগ অস্বীকার মাজহারের  :  তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাজহারুল ইসলাম। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আমি কারও ওপর কোনো নির্যাতন করিনি। ইসরারুলের ওপর মারধরের সময় ঘটনাস্থলেও ছিলাম না। অন্য কোথাও কিছু করে মার খেয়ে এসে এখন আমার ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।”

তিনি আরও দাবি করেন, “সুমনকে আগেই সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এটা বিএনপি এমপি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও আমাদের বিষয়। এটি আমরা নিজেরাই বুঝে নেব। এ বিষয়ে অন্য কারও কিছু বলার প্রয়োজন নেই।”

আতঙ্কে সাধারণ কর্মচারীরা :  বিআইডব্লিউটিএর সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের মধ্যে কাজ করছেন। অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার মেলে না। উল্টো নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদেরই রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে।

তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সংগঠনের নামে এমন দখলদারিত্ব, ভয়ভীতি ও সহিংসতা শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই ভেঙে দিচ্ছে না; বরং পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

👁️ 109 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *