# কোটি কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ # ক্ষমতার অপব্যবহার # ইজারা ও শুল্ক আদায়ে অনিয়মের অভিযোগ # তদন্তের আওতায় একাধিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও সিবিএ নেতা #

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একের পর এক অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনের সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, বেতন-ভাতা, ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা এবং পারিবারিক সম্পদের তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
দুদকের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বিআইডব্লিউটিএতে অবৈধ অর্থ উপার্জনের বিভিন্ন খাত চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। কমিশনের তথ্যমতে, সংস্থাটির এক ডজনেরও বেশি কর্মকর্তা ও কর্মচারী বর্তমানে অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছেন। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অনুসন্ধানের আওতায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে : বিআইডব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক এবং ভূমি ও আইন বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বে) এ কে এম আরিফ উদ্দিন ওরফে আরিফ হাসনাত, ড্রেজিং বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছাইদুর রহমান, ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলাম, প্রশাসন শাখার উপ-পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম ভুঁইয়া এবং শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম।

নদীতীর উচ্ছেদ ও ইজারা কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের দায়িত্ব পালনকালে আরিফ উদ্দিন তুরাগ ও বুড়িগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম, নদীতীরভূমি ইজারা এবং রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়েছেন।
এসব অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদকের উপ-পরিচালক (অনু ও তদন্ত-২) মো. হাফিজুল ইসলামকে প্রধান এবং সহকারী পরিচালক সুভাষ চন্দ্র মজুমদারকে সদস্য করে দুই সদস্যের অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, অনুসন্ধান শুরুর পর দুদক তার চাকরি জীবনের শুরু থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত উত্তোলিত বেতন-ভাতা, দায়িত্ব সংক্রান্ত অফিস আদেশ, নিজ, স্ত্রী, সন্তান ও ভাইদের নামে পরিচালিত ব্যবসা ও শেয়ার সংক্রান্ত সকল তথ্য ও নথিপত্র চেয়ে বিআইডব্লিউটিএকে চিঠি দিয়েছে।
নদী খনন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ : ড্রেজিং বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক নদী খনন প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান চলছে।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তার এবং তার স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের উৎস বৈধ দেখাতে বিভিন্ন সময় মিথ্যা তথ্য ও ভুয়া কাগজপত্রও উপস্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছে দুদক।
রুট পারমিট ও সময়সূচি অনুমোদনে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ : ক্রয় ও সংরক্ষণ বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধেও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক থাকাকালে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী নৌযানের রুট পারমিট এবং সময়সূচি অনুমোদনে অর্থ লেনদেন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। একাধিক নৌযান মালিক লিখিতভাবে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সিবিএ নেতার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা : নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের সাবেক শুল্ক আদায়কারী এবং বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক।
একই সঙ্গে অবৈধ সম্পদ অর্জনে সহযোগিতার অভিযোগে তার স্ত্রী শাহিদা বেগমের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক সাঈদ মোহাম্মদ ইমরান হোসেন গত ২০ সেপ্টেম্বর দুদকের নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ে মামলা দুটি দায়ের করেন।
আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের প্রস্তুতি : দুদক সূত্রে জানা গেছে, ড্রেজিং বিভাগের একজন প্রভাবশালী জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী, একই বিভাগের এক কর্মচারী, আরও দুই কর্মচারী এবং প্রশাসন বিভাগের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে আলোচিত ওই জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী গত এক দশকে একাধিক বড় নদী খনন প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন। অনুসন্ধানের আওতায় থাকা তিন কর্মচারীর প্রত্যেকেই সিবিএর গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাদের মধ্যে একজন অতীতে দুদকের তলবের মুখোমুখি হলেও নিজেকে দায়মুক্ত দাবি করে আসছেন। তবে দুদক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও তদন্তের সুযোগ সবসময়ই উন্মুক্ত থাকে এবং প্রয়োজন হলে নতুন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যেকোনো সময় পুনরায় অনুসন্ধান শুরু করা যেতে পারে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি : প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ ও দুদকের চলমান অনুসন্ধানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য জানার জন্য তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
তবে বারবার কল করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। এছাড়া কয়েকজনের কাছে খুদে বার্তা ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্টদের কোনো বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
দুর্নীতির গভীরে অনুসন্ধান : দুদকের চলমান অনুসন্ধানগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নদী খনন প্রকল্প, নদীতীর ইজারা, উচ্ছেদ কার্যক্রম, রুট পারমিট, শুল্ক আদায় এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারকে কেন্দ্র করে বিআইডব্লিউটিএর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলয় সক্রিয় ছিল কি না, সেটিই এখন অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে।
অনুসন্ধান শেষ হলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থায় সংঘটিত অভিযোগকৃত অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের নেপথ্যের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
