ভাঙা আয়নায় শিক্ষকের মর্যাদা: গাফিলতি না সুনিয়ন্ত্রিত ষড়যন্ত্র?

Uncategorized জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী শিক্ষাঙ্গন সারাদেশ

প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান  :  জাতীয় জীবনের মূল ভিত্তিপ্রস্তর হলো শিক্ষা। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো একটি জাতির মৌলিক গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বিনির্মাণের সুতিকাগার। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক বা উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগের প্রক্রিয়াটি কেবল কোনো রুটিনমাফিক প্রশাসনিক কাজ হতে পারে না; এটি রাষ্ট্রের প্রতি এক পবিত্র ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা।


বিজ্ঞাপন

যেখানে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, মেধা ও নৈতিকতার নূন্যতম বিচ্যুতি ঘটে, সেখানে পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপরই জনমনে গভীর অনাস্থা তৈরি হয়। **জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়**-এর উপাচার্য নিয়োগের সাম্প্রতিক ঘটনাটি কেবল একটি প্রশাসনিক ‘ভুল’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; এটি মূলত আমলাতান্ত্রিক অবক্ষয়, প্রাতিষ্ঠানিক নৈরাজ্য এবং মেধার প্রতি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

কী ঘটল: একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রহসনের চালচিত্রঃ
সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদকে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে মনোনীত ও প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে, দীর্ঘ ২৩ দিন পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সেই প্রজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করে নেয় এবং দাবি করে—ঘটনাটি ‘অনবধানতাবশত’ বা ভুলক্রমে ঘটেছে।


বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরের একটি প্রজ্ঞাপন জারির পূর্বে নথিগুলো যেভাবে বহুস্তরীয় যাচাই-বাছাই, স্ক্রুটিনি এবং নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনে পৌঁছায়—সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বা শিক্ষকের নাম বদলে যাওয়ার মতো মৌলিক ভ্রান্তি কীভাবে সম্ভব, তা যেকোনো সচেতন নাগরিককে স্তম্ভিত করে। ২৩ দিন ধরে একটি প্রজ্ঞাপন বহাল থাকা এবং পরবর্তীতে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও আইনি ব্যাখ্যা ছাড়াই তা প্রত্যাহার করা কি কেবলই প্রশাসনিক অদক্ষতা? নাকি এর পেছনে কাজ করেছে কোনো গভীর মনস্তাত্ত্বিক খেলা কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের অদৃশ্য রথচালনা—তা আজ বড় প্রশ্ন।


বিজ্ঞাপন

মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দিক: একজন শিক্ষকের সামাজিক লাঞ্ছনা :  এই পুরো নাটকের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন একজন সম্মানিত অধ্যাপক, গবেষক এবং মানুষ গড়ার কারিগর। একটি রাষ্ট্রীয় ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর তা আকস্মিকভাবে প্রত্যাহার করা মানে কেবল একটি প্রজ্ঞাপন বাতিল করা নয়; বরং একঝটকায় সেই শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত সুনাম এবং দীর্ঘদিনের অর্জিত অ্যাকাডেমিক আত্মসম্মানকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া।

আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষকের স্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধার। ফলে, এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ একজন শিক্ষাবিদকে তীব্র মানসিক ট্রমা, সামাজিক অপদস্থতা এবং পেশাগত বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়। এই অপূরণীয় মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ক্ষতির দায়ভার রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কীভাবে এড়াতে পারে?

আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও তদন্তের অনিবার্যতা :  একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ফাইল রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী মহলের বহু টেবিল ঘোরে, একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর পেরিয়ে চূড়ান্ত রূপ নেয়। এতগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ফিল্টার থাকার পরও যদি ২৩ দিন পর ত্রুটি ধরা পড়ে, তবে বুঝতে হবে আমাদের ‘চেইন অব কমান্ড’ এবং আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতার ভিত্তি কতটা নড়বড়ে।
কার্যকর ও পক্ষপাতহীন তদন্ত ছাড়া এই প্রাতিষ্ঠানিক কলঙ্ক মুছে

ফেলা সম্ভব নয়। তাই আমাদের দাবি :  বিচার বিভাগীয় তদন্ত: সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং সময়নির্ধারিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

জনসমক্ষে প্রতিবেদন: তদন্ত প্রতিবেদনটি কোনো গোপন দপ্তরে চেপে না রেখে সম্পূর্ণ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: এই ঘটনার পেছনের কুশীলব, আমলা বা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় ও আইনগত কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

তথ্য অধিকারের প্রয়োগ: তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার তথ্য গোপনের চেষ্টা করা হলে, তা তথ্য অধিকার আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

সুশীল সমাজ ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর ‘কৌশলী নীরবতা’ এক নৈতিক দেউলিয়াত্ব  :  এই ঘটনার আরেকটি সবচেয়ে দুঃখজনক অধ্যায় হলো দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের রহস্যজনক নীরবতা। যারা সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং মেধার অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ হওয়ার কথা ছিল, তাদের এই আপাতঃনিস্পৃহতা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
“অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা বজায় রাখা প্রকারান্তরে সেই অন্যায়কে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ারই শামিল।” মেধা ও মর্যাদার এই প্রকাশ্য অবমাননার মুখে শিক্ষক সংগঠনগুলোর এই দলীয় বা কৌশলগত নীরবতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা দিচ্ছে। জনস্বার্থে এবং শিক্ষক সমাজের অস্তিত্বের স্বার্থেই এই নীরবতা ভাঙা জরুরি।

মেধার অবমাননা: উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ সংকট  :  যাঁকে এই পদের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল, তিনি কোনো সাধারণ অনুকম্পাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন; তিনি তাঁর মেধা, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে সমাদৃত। তাঁর মতো একজন যোগ্য মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ মূলত দেশের সামগ্রিক মেধা চর্চার ওপর এক বড় আঘাত।

যদি যোগ্যতা, সততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষিত না হয়, তবে আমাদের তরুণ ও প্রতিভাবান গবেষকেরা কেন দেশীয় অ্যাকাডেমিয়ায় অবদান রাখতে উদ্বুদ্ধ হবেন? এর সুদূরপ্রসারী ফল হিসেবে উচ্চশিক্ষা খাত আরও বেশি মেধাশূন্য ও মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়বে।

কাঠামোগত সংস্কার ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাবনা :  ভবিষ্যতে এই ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমূল সংস্কার আনা অপরিহার্য:
১. ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও অডিট ট্রেইল: রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও প্রজ্ঞাপন প্রক্রিয়াকরণে শতভাগ ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হোক, যেন প্রতিটি ফাইলের গতিবিধি ও পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট কর্মকর্তা ডিজিটালভাবে দায়বদ্ধ থাকেন।

২. স্বাধীন সার্চ কমিটি ও স্ক্রুটিনি বোর্ড: উপাচার্য নিয়োগের জন্য দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে একটি তিন স্তরের স্বাধীন সার্চ কমিটি এবং বহুপাক্ষিক স্ক্রুটিনি বোর্ড গঠন করতে হবে।

৩. সিটিজেন ওয়াচডগ বা নাগরিক পর্যবেক্ষণ মঞ্চ: উচ্চশিক্ষার স্বচ্ছতা, শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা তদারকির জন্য শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ‘নাগরিক পর্যবেক্ষণ মঞ্চ’ গঠন করা প্রয়োজন।

৪. প্রকাশ্য দুঃখপ্রকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বাসন: যে যোগ্য শিক্ষাবিদকে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ও জনসমক্ষে দুঃখপ্রকাশ করতে হবে এবং তাঁর যোগ্য মর্যাদায় তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে ঘটে যাওয়া এই নাটকটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ভুল নয়; এটি আমাদের ভঙ্গুর প্রশাসনিক নীতি, অস্বচ্ছ আমলাতন্ত্র এবং মেধার প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। আমরা অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।

রাষ্ট্রীয় পদগুলো যদি মেধা, যোগ্যতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়ে আমলাতান্ত্রিক খেয়ালখুশির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে ‘ভাঙা আয়নায়’ আমরা বারবার কেবল আমাদের জাতীয় অবক্ষয়ের কদর্য রূপটিই দেখতে বাধ্য হবো।

লেখক পরিচিতি :  প্রফেশনাল ড. শেখ আসিফ এস. মিজান, ভাইস-চ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিসু, সোমালিয়া ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

👁️ 31 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *