
নিজস্ব প্রতিবেদক : গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে সাজাপ্রাপ্ত এক নারী আসামি দেয়াল টপকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কারাগারের মতো সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থাপনা থেকে একজন বন্দির পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা, নজরদারি ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

কারা সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাতে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মোছা. রিম্পা (২১) নামে এক সাজাপ্রাপ্ত নারী কয়েদি পালিয়ে যান। পরদিন শুক্রবার বিষয়টি জানাজানি হলে কারা অভ্যন্তরে তোলপাড় শুরু হয়। এ ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষ কোনাবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করেছে। পলাতক বন্দিকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।
জানা গেছে, মেহেরপুর জেলার গাংনী থানার রায়পুর এলাকার বাসিন্দা রিম্পা ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তিন মাসের সাজা পেয়ে কাশিমপুর মহিলা কারাগারে বন্দি ছিলেন।

লকআপ ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি, ভেঙে পড়েছে নজরদারি ?
কারা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে বন্দিদের নিয়মিত গণনার সময় রিম্পার অনুপস্থিতি ধরা পড়ে। পরে কারাগারের ভেতরে ও আশপাশে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, বিকেলে বন্দিদের নির্ধারিত সময়ে কক্ষে পাঠানোর (লকআপ) নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় নিরাপত্তার বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়। ওই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রিম্পা কারাগারের দেয়াল টপকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে একজন বন্দির প্রতিটি মুহূর্ত কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকার কথা, সেখানে কীভাবে একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি লকআপের বাইরে থাকার সুযোগ পেলেন? দায়িত্বপ্রাপ্ত কারারক্ষীদের নজরদারির ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও এখন তদন্তের বিষয়।
কারা ব্যবস্থাপনায় ‘সতর্ক সংকেত’ : বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাগার থেকে বন্দি পলায়নের ঘটনা শুধু একজন আসামির পালিয়ে যাওয়া নয়; এটি পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব পালনে সামান্য শৈথিল্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কাশিমপুর মহিলা কারাগারের ঘটনায় লকআপ প্রক্রিয়া, ডিউটি রোস্টার, কারারক্ষীদের দায়িত্ব পালন এবং বন্দিদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ, তদন্তের মুখে কারা কর্মকর্তারা
ঘটনার পর কারা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী বন্দিদের উপস্থিতি, অবস্থান ও চলাচল নিশ্চিত করার দায়িত্ব কারা প্রশাসনের। কিন্তু সেই ব্যবস্থায় ফাঁক তৈরি হওয়ায় একজন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা, কর্তব্যে গাফিলতি বা তদারকির ঘাটতি ছিল কি না, তা নির্ধারণে বিভাগীয় তদন্তের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বড় নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কারাগারের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় :
কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে বন্দি পলায়নের ঘটনা কারা প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার অভাবে যদি এমন ঘটনা ঘটে, তবে তা পুরো কারা ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন—একজন সাজাপ্রাপ্ত নারী কয়েদি কীভাবে কারাগারের দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছানোর সুযোগ পেলেন, আর সেই সময় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কোথায় ছিলেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই শুরু হয়েছে তদন্তের অপেক্ষা।
