
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর হালাল সার্টিফিকেশন কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে উত্থাপিত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে বিএসটিআই জানিয়েছে, হালাল সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফি-এর বাইরে কোনো ধরনের অর্থ, অনুদান (Contribution) কিংবা রপ্তানিকৃত পণ্যের পরিমাণ অনুযায়ী কোনো অর্থ আদায়ের বিধান নেই।

গত ১৮ জুলাই ২০২৬ বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত ‘হালাল ফর এক্সপোর্ট ডাইভার্সিফিকেশন’ শীর্ষক কর্মশালাকে উদ্ধৃত করে কয়েকটি গণমাধ্যমে বিএসটিআই’র হালাল সনদ কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে হালাল সার্টিফিকেট গ্রহণে অতিরিক্ত অর্থ দাবি, গাড়ি চাওয়া এবং ঘুষ নেওয়ার মতো অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
তবে বিএসটিআই এক আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্রে এসব অভিযোগকে “মিথ্যা, বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” আখ্যায়িত করে বলেছে, সংস্থার হালাল সার্টিফিকেশন কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে।
আইন ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে পরিচালিত হচ্ছে কার্যক্রম
বিএসটিআই জানিয়েছে, তাদের হালাল সার্টিফিকেশন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বিএসটিআই আইন-২০১৮, প্রবিধানমালা-২০২২, সরকারি গেজেট, ISO/IEC 17065 আন্তর্জাতিক মান এবং BDS OIC/SMIIC Halal Standards অনুসরণ করে।
সংস্থার দাবি, বিএসটিআই প্রবিধানমালা-২০২২ অনুযায়ী হালাল লাইসেন্স গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আবেদন ফি নির্ধারিত নেই। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই যাচাই-বাছাই শেষে হালাল সনদ প্রদান করা হয়।

৫ সদস্যের অডিট টিমের মাধ্যমে যাচাই : বিএসটিআই’র তথ্য অনুযায়ী, হালাল সনদ প্রদানের আগে অত্যন্ত কঠোর অডিট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় অংশ নেন—
এফবিসিসিআই প্রতিনিধি, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার মুফতি প্রতিনিধি, পুষ্টি ও খাদ্য বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের প্রতিনিধি এবং বিএসটিআই’র টেকনিক্যাল প্রতিনিধি। এছাড়া একজন ফিল্ড অফিসার সমন্বয়কারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অডিটের সময় পণ্যে কোনো নন-হালাল উপাদান রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ন্যাশনাল হালাল ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষা করে পণ্যের মান ও শরীয়াহ সম্মত বিষয় নিশ্চিত করা হয়।

১৫ সদস্যের ইমপার্শিয়াল কমিটির অনুমোদনের পর সনদ :
বিএসটিআই জানায়, অডিট শেষে প্রস্তুত করা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে গঠিত ১৫ সদস্যের ‘ইমপার্শিয়াল কমিটি’ (হালাল সার্টিফিকেশন কমিটি)-তে উপস্থাপন করা হয়।
এই কমিটিতে ব্যবসায়ী সংগঠন, শরীয়াহ বিশেষজ্ঞ, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। কমিটির অনুমোদনের পরই বিএসটিআই প্রবিধানমালা অনুযায়ী নির্ধারিত ফি গ্রহণ করে লাইসেন্স প্রদান করা হয়।
সংস্থার তথ্যমতে, হালাল লাইসেন্স ফি— ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য: ১ হাজার টাকা, মাঝারি শিল্পের জন্য: ৩ হাজার টাকা এবং
বৃহৎ শিল্পের জন্য: ৫ হাজার টাকা ফি পরিশোধের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে QR কোড সম্বলিত হালাল লাইসেন্স প্রদান করা হয়। বিএসটিআই স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, রপ্তানিযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতি মেট্রিক টনের বিপরীতে কোনো ধরনের ফি বা রাজস্ব আদায়ের কোনো বিধান নেই।
“গাড়ি চাওয়ার অভিযোগ’ অবান্তর: বিএসটিআই : হালাল অডিটের সময় গাড়ি চাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বিএসটিআই জানিয়েছে, সংস্থার যানবাহন সংকটের কারণে ঢাকা মহানগরীতে কারখানা পরিদর্শনের ক্ষেত্রে কখনো কখনো আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় তাদের নিজস্ব যানবাহনে অডিট টিম কারখানায় যাতায়াত করে থাকে।
তবে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে কারখানা পরিদর্শনের ক্ষেত্রে অডিট টিম নিজস্ব ব্যয়ে বাস বা ট্রেনে যাতায়াত করে কার্যক্রম সম্পন্ন করে। বিএসটিআই’র ভাষ্য, এ পরিস্থিতিতে হালাল সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে গাড়ি দাবি করার অভিযোগ সম্পূর্ণ অবান্তর ও বিভ্রান্তিকর।
ইজি ফুড ও বম্বে সুইটসের বিষয়ে ব্যাখ্যা : প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখিত “ইজি ফুড লিমিটেড” এবং “বম্বে সুইটস লিমিটেড” বিষয়ে বিএসটিআই জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠান দুটি কখনোই বিএসটিআই’র কাছে হালাল সনদের জন্য আবেদন করেনি। ফলে তাদের কোনো হালাল সার্টিফিকেটও প্রদান করা হয়নি।
বিএসটিআই আরও জানিয়েছে, সংবাদে যাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
বম্বে সুইটস অ্যান্ড কোং-এর জনাব খুরশিদ আলম এবং ইজি ফুড লিমিটেডের কর্নধার জনাব জিয়া হায়দার বিএসটিআইকে জড়িয়ে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের দাবি, গণমাধ্যমে তাদের বক্তব্য যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা সঠিক নয়।
‘যাচাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে’ :
বিএসটিআই বলছে, অভিযোগ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই এবং সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য গ্রহণ করা হলে সংবাদটি আরও বস্তুনিষ্ঠ হতো। যাচাই-বাছাই ছাড়া এমন সংবাদ প্রকাশের ফলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
সংস্থাটি দেশের জনগণ, শিল্পখাত, রপ্তানিকারক এবং আন্তর্জাতিক অংশীজনদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছে—হালাল সার্টিফিকেশন বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়নি।
বিএসটিআই’র দাবি, প্রতিটি আবেদন একই নীতিমালা, সরকারি ফি কাঠামো, সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
