অফিস নেই, কাজ নেই, বেতনও নেই—গণপূর্তের ৩১১ পদ সৃষ্টিতে ‘ভূতুড়ে পোস্টিং’ সংকট !   নবসৃষ্ট পদে বদলি-পদায়নের ১০ মাসেও মেলেনি দপ্তর, আটকে আছে আইবাস কোড; প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতায় বিপাকে শতাধিক প্রকৌশলী

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পরিকল্পনার ঘাটতিতে দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকৌশল সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তরে সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন এক সংকট। অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৃষ্ট ৩১১টি নতুন পদ এখন পরিণত হয়েছে এক ধরনের ‘ভূতুড়ে পোস্টিং’-এ। পদ আছে, পদায়ন আছে—কিন্তু নেই অফিস, নেই নির্ধারিত কর্মএলাকা, নেই প্রয়োজনীয় জনবল, এমনকি অনেকের আটকে আছে বেতন-ভাতাও।


বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া নতুন পদ সৃষ্টি করে তড়িঘড়ি বদলি ও পদায়নের ফলে ক্যাডার প্রকৌশলী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন এক অস্বাভাবিক প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা ডিভিশন-২ থেকে বদলি হয়ে শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ যোগ দেওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সানাউল্লাহ গত প্রায় ১০ মাস ধরে খুঁজছেন তাঁর নির্ধারিত অফিস ও কর্মএলাকা।


বিজ্ঞাপন

নতুন পদে দায়িত্ব পেলেও এখন পর্যন্ত নেই স্বতন্ত্র কার্যালয়, নেই প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক কাঠামো। ফলে তাঁর আওতাধীন এলাকার টেন্ডার, উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বিকল্প বিভাগের মাধ্যমে।


বিজ্ঞাপন

একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছেন জাতীয় সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন। ইএম ডিভিশন-১২-তে বদলি হওয়ার পর গত মার্চ মাস থেকে তিনি অফিস ও নির্ধারিত কাজের এখতিয়ার কোনোটিরই বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত পূর্ত ভবনের সংস্থাপন বিভাগে উপস্থিতি দেওয়া ছাড়া কার্যত তাঁর আর কোনো দায়িত্ব নেই।

শুধু নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যায়েই নয়, সংকট ছড়িয়েছে ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও। নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এর অধীনে ঢাকা ডিভিশন-৫ গঠিত হলেও বাস্তবে ওই বিভাগের অবকাঠামো না থাকায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোস্তফা কামালকে মহাখালী ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিবুল ইসলামের অফিস ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে একদিকে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজস্ব দপ্তর না পেয়ে সমস্যায় পড়েছেন, অন্যদিকে বিদ্যমান কর্মকর্তারাও পড়েছেন প্রশাসনিক বিড়ম্বনায়।

এদিকে বিসিএস গণপূর্তের ১৫তম ব্যাচের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মো. কায়কোবাদ চাকরির শেষ পর্যায়ে এসে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম) পদে পদোন্নতি পেলেও এখনও দপ্তর ও বেতন-সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। আগামী ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়ার আগে এমন অনিশ্চয়তা তাঁর জন্য তৈরি করেছে হতাশার পরিস্থিতি।

অফিস কোড ও আইবাস জটিলতায় আটকে বেতন  :  সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের আগস্টে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মতিক্রমে গণপূর্ত অধিদপ্তরের জন্য ৩১১টি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়। এর মধ্যে ১০৭টি ছিল বিসিএস ক্যাডার পদ। এরপর এসব পদে বদলি ও পদায়ন করা হলেও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অবকাঠামো প্রস্তুত করা হয়নি।

বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নতুন অফিসগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ‘অফিস কোড’ এবং আইবাস++ (iBAS++) কোড অনুমোদন না হওয়ায় দীর্ঘ ৮ থেকে ১০ মাস ধরে অনেক কর্মকর্তার বেতন-ভাতা আটকে রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সূত্র আরও জানায়, নতুন অফিসগুলোর কার্যক্রম চালু করতে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ১৯টি অফিসের আইবাস কোড সৃজনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু দীর্ঘ ৫ মাস পার হলেও এ বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।

ফলে নতুন বিভাগ ও ডিভিশনগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্প, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোটি কোটি টাকার সম্ভাব্য কাজের প্রশাসনিক অনুমোদন ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে স্থবিরতা।

‘পোস্টিং আছে, কিন্তু পরিচয় দেওয়ার মতো অফিস নেই’  : 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন,
“একজন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছি, কিন্তু নেই অফিস, নেই কাজের এলাকা, নেই যানবাহন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বেতনও নেই। সামাজিকভাবেও বিষয়টি বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেকে প্রশ্ন করেন—আপনি আসলে কোথায় কর্মরত?”  : 
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজন ছিল অফিস স্থাপন, জনবল বিন্যাস, বাজেট বরাদ্দ, যানবাহন ও হিসাব ব্যবস্থার প্রস্তুতি। কিন্তু এসব নিশ্চিত না করেই পদ সৃষ্টি ও পদায়নের কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

“দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে’: প্রধান প্রকৌশলী  :  এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরী সমস্যা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি জানান, নতুন সৃষ্ট পদগুলোর প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

তবে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া পদ সৃষ্টি ও পদায়ন একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে গতিশীল করার বদলে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাঁদের মতে, গণপূর্তের মতো বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সাংগঠনিক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা, আর্থিক অনুমোদন ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নিশ্চিত করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

নতুন ৩১১ পদের স্বপ্ন এখন বাস্তবায়নের বদলে কর্মকর্তাদের জন্য হয়ে উঠেছে এক প্রশাসনিক গোলকধাঁধা—যেখানে পদ আছে, কিন্তু নেই কর্মক্ষেত্র; দায়িত্ব আছে, কিন্তু নেই দপ্তর; আর চাকরি আছে, কিন্তু নেই নিশ্চিত বেতন।

👁️ 29 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *