“পেকু” ফিরোজ’কে ঘিরে বিদেশ সফর থেকে NDE-যোগ—গণপূর্তের বড় প্রকল্পে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী “পেকু” ফিরোজ হাসান।


বিজ্ঞাপন

 

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) কাজী মো. ফিরোজ হাসানকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। দীর্ঘ ১৭ বছর একই বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা, চাকরিজীবনের প্রায় পুরোটা সময় ঢাকায় অবস্থান, ১৭ দেশে কমপক্ষে ২৫ বার বিদেশ ভ্রমণ এবং সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের পর এবার আলোচনায় এসেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান NDE-এর সঙ্গে তার কথিত ঘনিষ্ঠতা ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ—NDE-কে সরকারি বড় বড় প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতে প্রকল্পের DPP প্রণয়ন থেকে শুরু করে টেন্ডারের শর্ত নির্ধারণ পর্যন্ত প্রভাব খাটানো হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরে NDE-এর চলমান ও সম্পন্ন প্রকল্পগুলোর DPP, প্রাক্কলন, টেন্ডার ডকুমেন্ট, যোগ্যতার শর্ত, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, কাজের আদেশ, বিল-ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্প (তৃতীয় পর্যায়) নিয়ে প্রশ্নটি আরও গুরুতর। অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (PD) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে NDE-কে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিকভাবে লাভবান করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি প্রকল্পটির সঙ্গে কাজী ফিরোজ হাসানের কথিত ‘পার্টনারশিপ’ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন। অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বেআইনি প্রভাবের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত।


বিজ্ঞাপন

১৭ বছর ‘পেকু’তে—প্রভাবের কেন্দ্রে থাকার অভিযোগ :
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকিউরমেন্ট এস্টেট ও কনস্ট্রাকশন ইউনিট—সংক্ষেপে পেকু—মূলত গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে প্রায় ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করার কারণে গণপূর্তে কাজী ফিরোজ হাসান ‘পেকু ফিরোজ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে ঢাকায় বদলি হওয়ার পর ২০০৯ সালে প্রায় এক মাস নেত্রকোনায় দায়িত্ব পালন ছাড়া তার কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় ঢাকা কেন্দ্রিক ছিল। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পেকুতে যোগ দেওয়ার পর ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী এবং পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পেকুতে দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবেও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে রয়েছেন বলে সূত্রের দাবি।

এত দীর্ঘ সময় একই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে অবস্থান করাকে ঘিরেই প্রশ্ন উঠছে—একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে একই সংবেদনশীল প্রকিউরমেন্ট-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের সঙ্গে বছরের পর বছর যুক্ত থাকলেন ?

আরও বড় প্রশ্ন—এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তার সিদ্ধান্ত বা সুপারিশে যেসব প্রকল্পে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেসব প্রকল্পের নথি কি কখনো স্বাধীনভাবে অডিট করা হয়েছে ? বিদেশ সফর: প্রশিক্ষণ, নাকি প্রভাবের আরেক ক্ষেত্র ?

কাজী ফিরোজ হাসানের বিদেশ সফর নিয়েও রয়েছে বিস্তর আলোচনা  :  তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জুনে মালয়েশিয়ায় ‘ফ্যাসিলিটি মডার্নাইজেশন’ শীর্ষক ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তার বিদেশ সফর শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে জাপান, মিসর, ইতালি, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়া, স্পেন, ভারত, তুরস্ক, বেলজিয়াম, গ্রিস, ফিনল্যান্ড ও বুলগেরিয়াসহ মোট ১৭টি দেশে কমপক্ষে ২৫ বার সফরের তথ্য সামনে এসেছে।

এ বিষয়ে ফিরোজ হাসানের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানিয়েছেন, তিনি এতগুলো প্রশিক্ষণে যাননি এবং গণপূর্তে তার চেয়েও বেশি বিদেশ সফর করেছেন এমন কর্মকর্তাও রয়েছেন।

কিন্তু প্রশ্নটি কেবল সফরের সংখ্যা নয়। প্রশ্ন হলো—কোন প্রকল্পের আওতায় ? কোন সরকারি আদেশে, কী উদ্দেশ্যে ? কত টাকা ব্যয়ে এবং প্রশিক্ষণ শেষে অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে কোন সরকারি কাজে প্রয়োগ করা হয়েছে ?

এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রতিটি বিদেশ সফরের সরকারি অনুমোদন, সফরসূচি, ব্যয়ের বিবরণ, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সনদ এবং সফর-পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আনা হলে বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।

NDE-যোগের অভিযোগ  : তদন্তের কেন্দ্রে আসা উচিত টেন্ডার শর্ত : নতুন অভিযোগের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গাটি হলো NDE-এর সঙ্গে কথিত আর্থিক সম্পর্ক এবং সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের দাবি, ফিরোজ হাসানের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বড় প্রকল্পগুলোর DPP প্রস্তুতের সময় এমন কিছু কারিগরি ও যোগ্যতার শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতায় সুবিধা দিতে পারে। পরবর্তী সময়ে টেন্ডার প্রক্রিয়াতেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

এ অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; বরং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট গুরুতর প্রশ্ন ? তাই তদন্তের শুরুতেই কয়েকটি বিষয় পাশাপাশি মিলিয়ে দেখা জরুরি— NDE অংশ নেওয়া প্রতিটি বড় প্রকল্পের DPP কে প্রস্তুত করেছেন ? DPP-তে অন্তর্ভুক্ত কারিগরি শর্তের প্রস্তাবক কে ছিলেন? টেন্ডারের যোগ্যতার শর্ত তৈরিতে কারা যুক্ত ছিলেন ? একই ধরনের কাজের অন্য টেন্ডারের সঙ্গে শর্তগুলোর পার্থক্য কী ? টেন্ডারে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কত ছিল? মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রাথমিক কারিগরি শর্তের সম্পর্ক কী ? প্রকল্প পরিচালক, পরামর্শক, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না ? এবং কাজের বিপরীতে অর্থ ছাড়, variation, অতিরিক্ত কাজ ও সংশোধিত প্রাক্কলনে কোনো অস্বাভাবিকতা ঘটেছে কি না ?

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রকল্পে ‘পার্টনারশিপ’—সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই : সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্প (তৃতীয় পর্যায়) নিয়ে ওঠা অভিযোগটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ, অভিযোগ অনুযায়ী, ফিরোজ হাসান প্রকল্পটির PD থাকার সময় NDE-কে বিভিন্নভাবে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিলেন।

এমনকি তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কথিত ‘পার্টনারশিপ’-এর অভিযোগও রয়েছে। এখানে পার্টনারশিপ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে—ব্যবসায়িক স্বার্থ, আর্থিক লেনদেন, মধ্যস্থতাকারী সম্পর্ক নাকি অন্য কোনো যোগসূত্র—তা নথিপত্র ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু অভিযোগটি এতটাই গুরুতর যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পুরো procurement trail স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে DPP থেকে শুরু করে tender notice, technical specification, BOQ, contract agreement, work order, running bill, variation order এবং final payment পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ অডিট করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও খতিয়ে দেখা দরকার  : ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কাজী ফিরোজ হাসান একটি রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে সহকর্মীদের বিষয়ে তথ্য সরবরাহ এবং মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সামনে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক ‘আমলনামা’ সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন মহলে সরবরাহ করা এবং পদায়ন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ের নথি, বদলি-পদায়ন সংক্রান্ত নোটশিট, সভার কার্যবিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা করাই যথেষ্ট হতে পারে।

মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী–সচিবের কাছে সরাসরি প্রশ্ন : গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের কাছে এখন প্রশ্ন—একই কর্মকর্তা কীভাবে বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ প্রকিউরমেন্ট-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকতে পারেন ? কেন তার দায়িত্বকালে সম্পাদিত বড় প্রকল্পগুলোর procurement audit করা হবে না ? NDE-এর সঙ্গে তার কথিত সম্পর্কের অভিযোগ সত্য কি না, তা যাচাই করতে স্বাধীন তদন্ত হবে কি ? সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রকল্পের DPP থেকে চূড়ান্ত বিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের ফরেনসিক অডিট হবে কি ? তার ১৭টি দেশে কমপক্ষে ২৫টি বিদেশ সফরের প্রতিটি সফরের সরকারি প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয় যাচাই করা হবে কি ? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে প্রকল্পের DPP বা টেন্ডারের শর্ত প্রভাবিত করে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কি বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে ?

কাগজ খুললেই সত্য বেরিয়ে আসবে’ :  কাজী ফিরোজ হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে নথি উন্মুক্ত করে তদন্ত করা। অভিযোগকারীদের বক্তব্য যেমন যাচাই করতে হবে, তেমনি অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য ও ব্যাখ্যাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবে অভিযোগের ধরন বিবেচনায় বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগও নেই। কারণ এটি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধের অভিযোগ নয়; বরং সরকারি প্রকল্প, শত শত কোটি টাকার ক্রয়প্রক্রিয়া, টেন্ডারের প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের বড় বড় প্রকল্পে NDE-এর অংশগ্রহণ, সংশ্লিষ্ট DPP, টেন্ডারের শর্ত, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং কাজের আর্থিক নিষ্পত্তি যদি স্বাধীন তদন্তের আওতায় আনা হয়, তাহলে অভিযোগের পেছনে বাস্তব কোনো অনিয়ম আছে কি না—তা সহজেই স্পষ্ট হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অভিযোগগুলোকে ‘আরেকটি অভিযোগ’ হিসেবে ফাইলবন্দি করবে, নাকি নথি খুলে সত্য উদঘাটনের সাহস দেখাবে। কারণ প্রশ্নটি একজন কাজী ফিরোজ হাসানের নয়—প্রশ্নটি সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, গণপূর্তের প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের নিরাপত্তার।

👁️ 40 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *