
নিজস্ব প্রতিবেদক : মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর যোদ্ধা, ‘কিলো ফ্লাইট’-এর কিংবদন্তি কমান্ডার এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ, বীর উত্তম, এসিএসসি (অব.)-এর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করেছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী।

এ উপলক্ষে শুক্রবার বিমান বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটি ও ইউনিটের মসজিদে বাদ জুমা তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের ওপর আলোকপাত করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। এ সময় তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়।
মুক্তিযুদ্ধের অনন্য এক বীর : এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ, বীর উত্তম, এসিএসসি, জিডি (পি), ১৯৪৪ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন নোয়াখালী—বর্তমানে ফেনী—জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম নূরুল হুদা এবং মাতা মরহুমা আনকুরেন্নেছা বেগম।

তিনি ঢাকার আরমানিটোলা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের সারগোদার পিএএফ পাবলিক স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ১৯৬২ সালে রিসালপুরের পিএএফ একাডেমি থেকে এফএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার স্টাফ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৬০ সালের ১৯ আগস্ট তিনি তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনী একাডেমিতে যোগ দেন এবং ১৯৬২ সালের ১ জুলাই জিডি (পি) শাখায় কমিশন লাভ করেন। কর্মজীবনে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পেশাগত কোর্সে অংশ নিয়ে সফলতার সঙ্গে তা সম্পন্ন করেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ও চৌকস বৈমানিক।
পাকিস্তান বিমান বাহিনী ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে : ১৯৭১ সালে বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম শুরু হলে দেশপ্রেমের অদম্য চেতনায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তৎকালীন স্কোয়াড্রন লীডার সুলতান মাহমুদ।
মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ২ নম্বর সেক্টরের মতিনগর ও মেলাঘর এলাকায় স্থলযুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তীতে ১ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রামগড় থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তিনি পরিচালনা করেন একের পর এক দুঃসাহসিক অভিযান। গেরিলা কমান্ডার হিসেবে তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য অভিযান ছিল চট্টগ্রামের মদুনাঘাটে বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন ধ্বংস করে ওই অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া।
স্থলযুদ্ধের এক পর্যায়ে শত্রুর গুলিতে তাঁর ডান হাঁটুতে আঘাত লাগে। যুদ্ধাহত অবস্থায় চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার পরও থেমে থাকেননি এই বীর যোদ্ধা।
‘কিলো ফ্লাইট’-এর নেতৃত্বে নতুন অধ্যায় : ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে নবগঠিত ‘কিলো ফ্লাইট’-এর অধিনায়কত্ব গ্রহণ করেন তৎকালীন স্কোয়াড্রন লীডার সুলতান মাহমুদ। এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন নবগঠিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নেতৃত্বে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে পাইলট ইন কমান্ড হিসেবে অ্যালুয়েট-III হেলিকপ্টারে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেল ডিপোতে আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর নেতৃত্বে প্রথম বিমান আক্রমণ অভিযান।
তাঁর চৌকস নেতৃত্বে অল্প সময়ের মধ্যেই ‘কিলো ফ্লাইট’ মোট ৫০টি দুঃসাহসিক বিমান অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করে। এর মধ্যে সুলতান মাহমুদ নিজে সরাসরি অংশ নেন ২৫টি অভিযানে।
আকাশপথে পরিচালিত এসব অভিযানে শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি তাদের মনোবলেও আঘাত হানে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনে এসব অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই সঙ্গে স্থলযুদ্ধে নেতৃত্ব, নবগঠিত বিমান বাহিনীর সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং আকাশযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ—তিন ক্ষেত্রেই তাঁর অসামান্য সাহসিকতা তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশাত্মবোধ, সাহসিকতা ও অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।
বিমান বাহিনী পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
স্বাধীনতার পর এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের বিমান বাহিনীকে একটি সুসংগঠিত ও কার্যকর বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
১৯৮১ সালের ২৩ জুলাই তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে ১৯৮৭ সালের ২৩ জুলাই তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অনন্য ভূমিকা, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে সুসংগঠিত ও কার্যকর বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদান এবং পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে দেশ গঠনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১৮’-এ ভূষিত করে।
৭৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস : বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে ৩৬ বছর ২২ দিন অবসর জীবনযাপন করেন এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ, বীর উত্তম, এসিএসসি (অব.)।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর ১৪ দিন। তিনি স্ত্রী, এক কন্যা, এক পুত্র এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে আকাশযুদ্ধের ইতিহাস—সবখানেই এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদের অবদান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ‘কিলো ফ্লাইট’-এর সাহসী নেতৃত্ব এবং দেশমাতৃকার জন্য তাঁর আত্মত্যাগ ও বীরত্ব নতুন প্রজন্মের কাছে চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও দেশবাসী গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে এই কিংবদন্তি বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করা হয়েছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানানো হয়েছে গভীর সমবেদনা। (তথ্য সুত্র ও ছবি : আই.এস.পি.আর)
