১০ তলা ভবনের নামে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার ‘ভুয়া বিল’ : বাস্তবে ৮ তলা, নথিতে ১০ তলা! প্রকৌশলী হাসান শওকতকে ঘিরে দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী শিক্ষাঙ্গন সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ে ১০ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে উঠেছে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ভুয়া বিল উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের প্রকৌশলী হাসান শওকত এবং সংশ্লিষ্ট একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা মূল্যের এমন কিছু কাজের বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যার বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের নকশা ও কার্যাদেশ অনুযায়ী ভবনটি ১০ তলা হওয়ার কথা থাকলেও সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্মাণকাজ বাস্তবে আট তলা পর্যন্ত গিয়েই থেমে আছে। অথচ অভিযোগ রয়েছে, নথিপত্রে নবম ও দশম তলার বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

ঘটনাটি সত্য হলে এটি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়—সরকারি প্রকল্পের পরিমাপ, বিল অনুমোদন ও তদারকি ব্যবস্থার ওপরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।


বিজ্ঞাপন

নথিতে কাজ শেষ, বাস্তবে নেই নবম-দশম তলা : প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন প্রকল্পটির পরিমাপ বই বা এমবি’র ৪৬ থেকে ৯৪ নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিভিন্ন কাজের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে সপ্তম চলতি বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো—যে সময়ে ভবনের নবম ও দশম তলার ছাদ ঢালাইয়ের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব ছিল না, সে সময় নথিতে মেমব্রেন, কাঠের শাটারিং, লিন্টেল, রড বাঁধাই ও পিলারসহ বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ। অর্থাৎ, বাস্তব অগ্রগতি আর কাগজে দেখানো অগ্রগতির মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে—এমন অভিযোগই এখন সামনে এসেছে।

এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে এমবি, কার্যাদেশ, নকশা, চলতি বিল, বিলের সঙ্গে সংযুক্ত পরিমাপ, প্রকৌশলীর প্রত্যয়ন এবং বাস্তব নির্মাণকাজ—সবকিছু স্বাধীনভাবে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

সাত বছরেও শেষ হয়নি ভবন, চরম ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা :
প্রকল্পটি প্রায় সাত বছর ধরে চলমান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভবনটির কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে যে নতুন ভবনে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা ও অভিযোগের কেন্দ্রে। পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শ্রেণিকক্ষের সংকট এমনিতেই প্রকট। নতুন ভবনটি সময়মতো সম্পন্ন না হওয়ায় শত শত শিক্ষার্থীকে সীমিত জায়গায় পাঠদান করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নতুন ভবনটি নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু বছরের পর বছর নির্মাণকাজ ঝুলে থাকায় সেই প্রত্যাশা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। তার দাবি, ভবনের ওপরের দুই তলার কাজ না হয়েও যদি বিল পরিশোধ করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ভুয়া বিল’ কার অনুমোদনে ?  একটি সরকারি নির্মাণ প্রকল্পে কাজের বিপরীতে অর্থ পরিশোধের আগে সাধারণত পরিমাপ, কাজের বাস্তব অগ্রগতি, প্রকৌশলীর প্রত্যয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিল অনুমোদিত হওয়ার কথা।

সেক্ষেত্রে অভিযোগ অনুযায়ী, যদি নবম ও দশম তলার কাজ বাস্তবে না হয়েও নথিতে সম্পন্ন দেখানো হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—কে পরিমাপ করলেন, কে প্রত্যয়ন দিলেন, কে বিল প্রস্তুত করলেন এবং কার অনুমোদনে সরকারি অর্থ ছাড় হলো?  শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করলেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। প্রকল্প তদারকিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখাও জরুরি।

হাসান শওকতকে ঘিরে আরও প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ : 
ইইডির একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের প্রকল্পটিই একমাত্র নয়; ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্পে প্রকৌশলী হাসান শওকতের বিরুদ্ধে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—ঠিকাদারদের সঙ্গে কথিত সমঝোতার মাধ্যমে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ব্যয় বৃদ্ধি, কাজের তুলনায় বেশি অগ্রগতি দেখানো এবং বাস্তবে কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই পরিমাপ বইয়ে তা অন্তর্ভুক্ত করে বিল উত্তোলনের ব্যবস্থা করা।

এমন অভিযোগের কিছু বিষয়ে অতীতে বিভাগীয় পর্যায়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। তবে এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

দুর্নীতির অর্থে ক্যান্টনমেন্টে বিলাসী সম্পদের অভিযোগ  : হাসান শওকতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর আরেকটি অভিযোগ হলো—সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে রাজধানীর অভিজাত ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিপুল মূল্যের ফ্ল্যাট ও সম্পদ গড়ে তোলা। তবে এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সম্পত্তির দলিল, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঘোষিত সম্পদের বিবরণ যাচাই করা প্রয়োজন। কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো সম্পদকে দুর্নীতির অর্থে অর্জিত বলে চূড়ান্তভাবে দাবি করা যায় না। তবে অভিযোগটি সত্য হলে তা সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের সম্ভাব্য তদন্তের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

জবাবদিহির প্রশ্নে এখন তদন্তই ভরসা  : অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী হাসান শওকতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি এবং বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অন্যদিকে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য—সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া পরিমাপ বা ভুয়া বিলের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিযোগের নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি : এই ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর না মিললে পুরো প্রকল্পের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে— নবম ও দশম তলার কাজ বাস্তবে না হয়ে থাকলে এমবিতে তা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো ? সপ্তম চলতি বিলের ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে ঠিক কোন কোন কাজের জন্য অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে ? এমবির ৪৬ থেকে ৯৪ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত কাজগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব কি তৃতীয় পক্ষ দিয়ে যাচাই করা হয়েছে ? বিল অনুমোদনের আগে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি কে পরিদর্শন ও প্রত্যয়ন করেছেন?

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কত টাকা পেয়েছে এবং তার বিপরীতে বাস্তবে কত টাকার কাজ হয়েছে ? প্রকৌশলী হাসান শওকতের দায়িত্ব পালনকালে অন্যান্য প্রকল্পের বিল ও এমবি কি একইভাবে নিরীক্ষা করা হয়েছে ? ক্যান্টনমেন্টসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তার নামে বা সংশ্লিষ্টদের নামে থাকা সম্পদের অর্থের উৎস কী ?
তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র।

শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ :  এখন শুধু একটি ভবনের অসমাপ্ত নির্মাণকাজের বিষয় নয়; এটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে পরিমাপ, বিল অনুমোদন ও তদারকি ব্যবস্থার সম্ভাব্য দুর্বলতারও পরীক্ষা। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সব এমবি, কার্যাদেশ, নকশা, বিল-ভাউচার, ঠিকাদারি চুক্তি, অর্থ ছাড়ের হিসাব এবং প্রকল্পের বর্তমান বাস্তব অগ্রগতি সরেজমিনে যাচাই করা জরুরি।

একই সঙ্গে হাসান শওকত ও সংশ্লিষ্টদের সম্পদের হিসাব এবং অর্থের উৎসও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জনসম্মুখে তুলে ধরা প্রয়োজন।

কারণ প্রশ্নটি শুধু ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার নয়—প্রশ্নটি হলো, শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মিত হওয়ার কথা থাকা একটি ১০ তলা ভবনের টাকা শেষ পর্যন্ত কাগজে-কলমে ভবন বানিয়েছে, নাকি বাস্তবে?

👁️ 30 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *