
নিজস্ব প্রতিবেদক : পুলিশ টেলিকম সংস্থায় কর্মরত পরিদর্শক (আরওআই) মো. রেজাউল করিম ও তাঁর সহযোগী বেতার কনস্টেবল সোহাগের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যরা।

এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখিত আবেদনও করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে পুলিশ টেলিকমে অবস্থান ধরে রাখা রেজাউল করিম সাবেক কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। বিশেষ করে তিনি ওসি (এমটি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের বদলির ক্ষেত্রে জনপ্রতি ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে বদলির ক্ষেত্রে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, তদবির ও প্রভাব খাটিয়ে পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ ‘আরওআই’ (ROI) পদেও দায়িত্ব পান রেজাউল। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বদলি-সংক্রান্ত নথি, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ : অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের নাম ব্যবহার করে রেজাউল অনৈতিক সুবিধা নিতেন। সে সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে তিনি বিভাগীয় শাস্তির মুখেও পড়েছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টারও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর তিনি বিএনপিপন্থী পরিচয়ে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করেন।
৫ আগস্টের পর ডিএমপির শিরু মিয়া অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত একটি সভায় পুলিশের সাধারণ সমন্বয়কারীরা তাঁকে চিনতে পেরে ধাওয়া করে বের করে দেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বিস্তার কিংবা সভা থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
সরকারি কোয়ার্টার ঘিরে গুরুতর অভিযোগ : রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত জীবন ও সরকারি আবাসন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমানে স্ত্রী না থাকা সত্ত্বেও রাজারবাগ পুলিশ কোয়ার্টার তাঁর নামে বরাদ্দ রয়েছে এবং সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এমটি শাখায় কর্মরত বেতার কনস্টেবল সোহাগ সরাসরি রেজাউলকে নারী সরবরাহের কাজে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে এক নারীকে স্ত্রী পরিচয়ে রেজাউল ওই কোয়ার্টারে নিয়ে যান বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পরদিন সকালে ডিএমপির ১ নম্বর গেটে ওই নারী আটক হলে কনস্টেবল সোহাগ ও স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় প্রভাব খাটিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এ ছাড়া কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরকারি বাসভবন অবৈধভাবে সাবলেট দিয়ে অর্থ উপার্জনের অভিযোগে রেজাউল সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিকেই প্রতিবেদনের পর্যায়ে আদালত বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
‘শাস্তি নয়, বদলি’—প্রশ্ন পুলিশের ভেতরে ; অভিযোগের ; পরিপ্রেক্ষিতে ২০ আগস্ট ২০২৬ এডিশনাল আইজিপি (টেলিকম) মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে পরিদর্শক রেজাউল করিমকে ট্রেনিং শাখায় বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বদলি আদেশ নিয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারী ও ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যরা।
তাঁদের প্রশ্ন—গুরুতর দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ থাকলে শুধু এক শাখা থেকে অন্য শাখায় বদলি করাই কি যথেষ্ট ? তাঁদের ভাষ্য, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে শুধু বদলি করা হলে সেটি কার্যত প্রশাসনিক স্থানান্তরেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এতে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর বার্তা যাওয়ার পরিবর্তে উল্টো অভিযুক্তদের মধ্যে দায়মুক্তির ধারণা তৈরি হতে পারে।
‘খুঁটির জোর’ কোথায়—তদন্তের দাবি : ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের দাবি, রেজাউল করিম ও কনস্টেবল সোহাগের পেছনে কারা প্রভাবশালী, তাদের কথিত ‘খুঁটির জোর’ কোথায় এবং কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে তারা প্রভাব বিস্তার করে আসছেন—তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন। অভিযোগকারীরা শুধু প্রশাসনিক বদলিতে বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে বিভাগীয় মামলা, প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং অভিযোগের ধরন অনুযায়ী ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি : রেজাউলের : অভিযোগের বিষয়ে পরিদর্শক মো. রেজাউল করিমের বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ : অভিযোগের অনুলিপি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), অতিরিক্ত আইজিপি (অ্যাডমিন), অতিরিক্ত আইজিপি (টেলিকম) এবং ডিআইজি (অ্যাডমিন)-সহ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন—বিষয়টি কি কেবল একটি বদলি আদেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে? কারণ, অভিযোগ সত্য হলে শুধু বদলি নয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি; তেমনি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের অবসান ঘটানো প্রয়োজন। পুলিশের মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তই পারে ‘বদলি দিয়ে দায় এড়ানোর’। অভিযোগের অবসান ঘটাতে এবং বাহিনীর ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে।
