
আরমান হোসেন রাজু, (রংপুর) : গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে মুমূর্ষু অবস্থায় স্ত্রী শাহিনা বেগমকে (২২) হাসপাতালে নিয়ে আসার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করলে প্রাইভেট কার চালিয়ে দ্রুত পালানোর চেষ্টা করেছেন স্বামী মোরসেলিম আকাশ সিয়াম। হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বের হয়ে গেলেও পরবর্তীতে তাঁকে আটক করেছে পুলিশ।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মাদকাসক্ত সিয়ামের শারীরিক নির্যাতনের কারণেই শাহিনার মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঘটে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সচালক হৃদয় মণ্ডল জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে সিয়াম নিজেই গাড়ি চালিয়ে শাহিনাকে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন। জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক চিকিৎসা শুরুর অংশ হিসেবে ইসিজি (ECG) পরীক্ষা করে শাহিনাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত্যুর সংবাদ শোনামাত্রই সিয়াম কালক্ষেপণ না করে দ্রুত গাড়িতে উঠে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা গাড়িটি থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত সিয়ামকে আটক করতে সক্ষম হয়।

নিহত শাহিনা বেগম পলাশবাড়ী সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি সাদুল্লাপুর উপজেলার ইদিলপুর গ্রামের প্রয়াত শাহাজাদা মিয়া ও রহিমা বেগমের মেয়ে। শাহিনার মা রহিমা বেগম পলাশবাড়ী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে নকলনবিশ হিসেবে কর্মরত আছেন।
অভিযুক্ত মোরসেলিম আকাশ সিয়াম পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মাঝহারুল ইসলাম মিতুর ছেলে। প্রেমঘটিত সম্পর্কের সূত্র ধরে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। চার বছর ও এক বছর বয়সী আয়াশ ও আয়াত নামে দুটি সন্তান রয়েছে এই দম্পতির।
শাহিনার মা রহিমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করে বলেন, বিয়ের পর থেকেই যৌতুক ও তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে শাহিনাকে শারীরিক নির্যাতন করে আসছিলেন সিয়াম। সিয়াম নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। ঘটনার আগের দিন এবং ঘটনার দিনও শাহিনাকে নৃশংসভাবে মারধর করা হয়, যার ধারাবাহিকতায় এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
নিহতের চাচা মাজিদুর রহমান জানান, সিয়ামের মাদকাসক্তি ও পারিবারিক কলহ নিয়ে একাধিকবার স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠক হলেও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। এটিকে পারিবারিক কলহের জেরে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দাবি করে সুষ্ঠু বিচার প্রার্থনা করেন তিনি।
পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. শামা তাবাসসুম জানান, শাহিনাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিহতের গলায় ফাঁস লাগানোর স্পষ্ট দাগ পাওয়া গেছে।
পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরোয়ার আলম খান জানান, খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়। শুক্রবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হবে।
ওসি আরও জানান, অভিযুক্ত সিয়াম বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক ও চূড়ান্ত কারণ জানা সম্ভব হবে।
