
আল আমিন সরদার :
ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানমকে ঘিরে তাঁর আগের কর্মস্থল চট্টগ্রামের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা পুরোনো অভিযোগের পাশাপাশি ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ইউপি সচিব) বদলি-পদায়ন ঘিরে নতুন করে নানা অভিযোগ ও প্রশ্ন উঠেছে।

চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত, ভূমির রেকর্ড ও নামজারি, বালুমহাল ইজারা, সরকারি অর্থ ও তহবিল ব্যবহারের পদ্ধতি এবং চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার অর্থ ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। এসব অভিযোগের কয়েকটি বিষয়ে তদন্তের তথ্যও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে আসে।
তবে এসব অভিযোগের সবকটিই প্রমাণিত হয়েছে—এমন চূড়ান্ত আদালতের রায় বা সরকারি সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল সামনে আনা জরুরি।
চট্টগ্রামে সরকারি খাসজমি নিয়ে প্রশ্ন : চট্টগ্রাম নগরের পরীর পাহাড় এলাকায় জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ করা ২৩ শতকের বেশি সরকারি জমি নিয়ে ফরিদা খানমের দায়িত্বকালেই প্রশ্ন ওঠে।
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, উচ্ছেদের পর জনস্বার্থে ব্যবহারের পরিবর্তে ওই জমি অস্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জমিটি কোন বিধি অনুযায়ী এবং কী মেয়াদে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল—তা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়েছিল, জমিটি এক বছরের জন্য অস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে পাকা স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি নেই।

বিজ্ঞাপন
খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারির অভিযোগ : চট্টগ্রামের হিলভিউ আবাসিক এলাকার সরকারি খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি করার অভিযোগও সামনে আসে। এ ঘটনায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের তদন্তের তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তদন্তে ভূমির রেকর্ড, নামজারি ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার কথা জানা যায়।
চট্টগ্রামের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনারও ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্তের কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন।
তবে এসব তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল কী এবং কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না—সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে না থাকলে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
বালুমহাল ইজারা ও ভূমির রেকর্ড নিয়ে অভিযোগ : চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে বালুমহাল ইজারা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ভূমির রেকর্ড জালিয়াতির অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ইজারা প্রক্রিয়া এবং ভূমি রেকর্ড সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এসব বিষয়ে তদন্ত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন ও সরকারি নথি প্রকাশের দাবি উঠেছে।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবহারে প্রশ্ন৷ : চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চিড়িয়াখানার অর্থ প্রশাসন ক্যাডারের পিকনিক, পুনর্মিলনী, বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের অভিযোগ ওঠে।
একটি প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত চিড়িয়াখানার তহবিল থেকে প্রায় ১৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল।
ফরিদা খানম এ ধরনের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে ব্যয়ের বিষয়ে তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতার কথা জানিয়েছিলেন।
সরকারি জমি ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ : চট্টগ্রাম থেকে বদলির সময় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে নগরীর সরকারি জমি নিয়ে তাঁর প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়। কোথাও কোথাও বিপুল পরিমাণ সরকারি জমি বন্দোবস্ত বা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
তবে এসব জমির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, প্রতিটি বন্দোবস্তের নথি এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আলাদাভাবে সরকারি নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঢাকায় যোগদানের পর নতুন অভিযোগ : চট্টগ্রামের পুরোনো অভিযোগের মধ্যেই ঢাকার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ফরিদা খানমকে ঘিরে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে ইউপি সচিবদের বদলি ও পদায়ন ঘিরে কথিত ‘বদলি বাণিজ্য’।
অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকায় যোগদানের পরপরই কয়েকজন ইউপি সচিবের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় হয়ে ওঠে।
তাঁদের অভিযোগ, পছন্দের কর্মস্থলে বদলি বা পদায়নের সুযোগকে কেন্দ্র করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
‘কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য’—অভিযোগকারীদের দাবি
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, ইউপি সচিবদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে কথিত লেনদেনের পরিমাণ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
তবে কোটি টাকার এই দাবির পক্ষে ব্যাংক লেনদেন, রসিদ, লিখিত অভিযোগ, অডিও-ভিডিও কিংবা কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এই প্রতিবেদনের হাতে নেই। ফলে বিষয়টি বর্তমানে অভিযোগকারীদের দাবি হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে গত কয়েক মাসে হওয়া ইউপি সচিবদের বদলির তালিকা, বদলির আবেদন, সুপারিশ, অনুমোদনের নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তিকে ব্যবহার করে বদলি-পদায়নসহ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
কয়েকজন ইউপি সচিবকে কেন্দ্র করে একটি ‘ছোট ভাই’ বলয় তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে কারা এই বলয়ের সদস্য এবং তাঁদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তির আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে কি না—এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ পরিচয়ের আড়ালে অভিযোগ ধামাচাপার চেষ্টা?
অভিযোগকারীদের দাবি, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি আড়াল করতে ফরিদা খানম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে উপস্থাপন করে বিভিন্ন মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের প্রচার চালিয়েছেন।
তাঁদের অভিযোগ, এসব প্রচারের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রচার নিজে কোনো অপরাধ বা দুর্নীতির প্রমাণ নয়। অভিযোগটি সত্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সময়ের সরকারি নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগগুলোর অগ্রগতি যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি একদিকে মানবিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রচার করেন, অন্যদিকে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তাহলে সেই অভিযোগগুলোর তদন্তের ফলাফলও জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত।
বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ তদন্তের দাবি : ইউপি সচিবদের বদলি-পদায়ন ঘিরে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি—
প্রথমত, গত কয়েক মাসে ইউপি সচিবদের সব বদলির তালিকা প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বদলির আবেদন, সুপারিশ ও অনুমোদনের নথি যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, একই কর্মকর্তা বারবার পছন্দের কর্মস্থলে বদলি পেয়েছেন কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। চতুর্থত, বদলির আগে ও পরে সংশ্লিষ্টদের অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না তা তদন্ত করতে হবে।
পঞ্চমত, কোনো লিখিত অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের আওতায় আনতে হবে। ষষ্ঠত, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রশ্ন উঠছে—তদন্ত কোথায়? ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম কর্মকালীন সময়ে ওঠা অভিযোগ এবং ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণের পর ইউপি সচিব বদলি ঘিরে ওঠা নতুন অভিযোগ—দুই ক্ষেত্রেই এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, অভিযোগগুলোর তদন্তের ফলাফল কী?
সরকারি জমি, সরকারি অর্থ কিংবা প্রশাসনিক বদলি-পদায়ন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোটি টাকার বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ সত্য হলে তার প্রমাণ অবশ্যই কোনো না কোনো নথি, আর্থিক লেনদেন, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বা তদন্তে উঠে আসার কথা। আবার অভিযোগটি অসত্য হলে তদন্তের মাধ্যমেই সেটিও পরিষ্কার করা সম্ভব।
ফরিদা খানমের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ : এসব অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার, ব্যাখ্যা বা সংশ্লিষ্ট নথি দেওয়া হলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা উচিত। কারণ সাংবাদিকতার দায়িত্ব কোনো ব্যক্তিকে আগেই অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করা নয়; বরং অভিযোগ, প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল জনগণের সামনে তুলে ধরা।
নথিভিত্তিক অনুসন্ধানের দাবি৷ : অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে শুধু বক্তব্য নয়, প্রয়োজন— বদলির আদেশ, সরকারি নথি, ভূমি রেকর্ড, বন্দোবস্তের কাগজপত্র, ইজারা সংক্রান্ত নথি, অডিট রিপোর্ট, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য।
এসব নথি সামনে এলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায়—ফরিদা খানমের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
শেষ কথা৷ : একজন জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে যত গুরুতর অভিযোগই উঠুক না কেন, সেগুলো তদন্ত ছাড়া প্রমাণিত দুর্নীতি বলা যায় না। একইভাবে গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর সেগুলো তদন্ত না করেও এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
তাই চট্টগ্রাম কর্মকালীন খাসজমি, ভূমি রেকর্ড, বালুমহাল ও তহবিল ব্যবহারের অভিযোগের পাশাপাশি ঢাকায় ইউপি সচিবদের বদলি-পদায়ন ঘিরে ওঠা কথিত ‘বদলি বাণিজ্য’ ও কোটি টাকার লেনদেনের দাবিও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি রাখে।
