গণপূর্ত অধিদপ্তরে ‘লটারি বাণিজ্য’: বদলি-পদায়নে ১২০ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের অভিযোগ, প্রশ্নে সরকারি নিয়োগবিধি

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

# গণপূর্ত অধিদপ্তরে ‘লটারি বাণিজ্য’: বদলি-পদায়নে ১২০ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের অভিযোগ,  #  প্রশ্নে সরকারি নিয়োগব   # ৩২ ও ৩৩ ব্যাচের কর্মকর্তাদের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়ন # জ্যেষ্ঠদের ঠাঁই জেলা পর্যায়ে  #  লটারির স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন   # অভিযোগের তির অতিরিক্ত সচিব সরোয়ার আলম  # তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহানসহ সংশ্লিষ্টদের দিকে  # তদন্ত ও ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ #


বিজ্ঞাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক :  গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের সাম্প্রতিক বদলি ও পদায়ন ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব, সরকারি চাকরির বিধিবিধানের অবমূল্যায়ন এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, লটারির মাধ্যমে পদায়নের কথা বলা হলেও ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগে আগে থেকেই পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

পরে একাধিক বাক্সে পছন্দের কর্মকর্তাদের নাম রেখে লটারির নামে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এ ঘটনায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সরোয়ার আলম, গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান এবং পদায়নপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে, পদায়নের তালিকায় কর্মকর্তাদের ব্যাচ, জ্যেষ্ঠতা, পূর্ববর্তী কর্মস্থল এবং ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পাওয়ার ধরন বিশ্লেষণ করে প্রশ্ন উঠেছে—লটারি আদৌ নিরপেক্ষ ছিল, নাকি এর আড়ালে আগে থেকে নির্ধারিত পদায়ন কার্যকর করা হয়েছে? অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।


বিজ্ঞাপন

লটারির নামে প্রহসন, আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ?  অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়নের ক্ষেত্রে ঢাকার চার থেকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ জন্য একাধিক বাক্সে কয়েকটি করে পছন্দের নাম অন্তর্ভুক্ত করে লটারির মাধ্যমে পদায়নের একটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ ও বিভাগ-২, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ ও বিভাগ-৪, ঢাকা মেডিকেল কলেজ বিভাগ এবং রাজধানীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থল। এসব বিভাগের কয়েকটিতে অপেক্ষাকৃত নবীন কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে পাঠানোর বিষয়টি লটারির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

তবে লটারিতে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাচ ও জ্যেষ্ঠতার পাশাপাশি পদায়নের যোগ্যতা, বিভাগভিত্তিক শূন্যপদ, পছন্দক্রম, লটারির মূল তালিকা, ব্যবহৃত বাক্সের বিবরণ এবং কার্যবিবরণী যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর অগোচরে লটারির নামে এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, অতিরিক্ত সচিব সরোয়ার আলম ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহানের সংশ্লিষ্টতায় পদায়নপ্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

৩২ ও ৩৩ ব্যাচের কর্মকর্তাদের ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন  : জ্যেষ্ঠদের জেলা পর্যায়ে পদায়নের তালিকা এবং অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ৩২ ও ৩৩ ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে দায়িত্ব পেয়েছেন। অন্যদিকে, ২৪, ২৭, ৩০ ও ৩১ ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা ঢাকার বাইরে পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ মাসুম বিল্লাহ (৩৩তম ব্যাচ), ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ কামরুল হাসান (৩২তম ব্যাচ), গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন-১ শাখায় জ্যোতিময় ভট্টাচার্য (৩৩তম ব্যাচ), প্রকল্প বিভাগ-৫-এ মনিরুজ্জামান জিতু (৩২তম ব্যাচ), ঢাকা মেট্রো জোনে স্টাফ অফিসার হিসেবে মাহমুদুল হাসান লিমন (৩৩তম ব্যাচ) এবং ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে রেজা তাইমুর মালিকের (৩২তম ব্যাচ) পদায়নের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মহাখালী গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্বে ইমরান (৩৩তম ব্যাচ) এবং সার্ভে-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে কাওসারের (৩২তম ব্যাচ) নাম অভিযোগকারীদের দেওয়া তালিকায় রয়েছে।

অন্যদিকে, ২৪তম ব্যাচের স্বর্ণেন্দু শেখর মণ্ডলকে মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগে, ২৭তম ব্যাচের আতিকুল ইসলামকে কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগে এবং ২৭তম ব্যাচের আব্দুস সাত্তারকে লালমনিরহাট গণপূর্ত বিভাগে পদায়নের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ২৭তম ব্যাচের মোহসিনকে ফেনী এবং জোয়ারদার তাবেদুন নবীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতার বিবেচনায় এসব পদায়ন কতটা যৌক্তিক ছিল? ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে কোন মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হলে বিতর্কের অবসান হতে পারে। তবে সরকারি চাকরিতে পদায়নের ক্ষেত্রে শুধু ব্যাচ বা জ্যেষ্ঠতাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। প্রশাসনিক প্রয়োজন, পদায়নযোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, শূন্যপদ এবং প্রযোজ্য বিধি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না, তা যাচাই করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন।

ই/এম শাখায়ও একই প্রশ্ন ? সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্তদের ঢাকায় পদায়ন : গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই/এম) শাখার নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়ন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩২তম ব্যাচের জুবায়েরকে ঢাকা ই/এম বিভাগ-২, রুহুল আমিনকে ঢাকা ই/এম বিভাগ-১০ এবং সামিরাকে ঢাকা ই/এম বিভাগ-১২-তে পদায়ন করা হয়েছে। তাঁদের তিনজনই সদ্য নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে, ২৮তম ও ৩০তম ব্যাচের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ই/এম কর্মকর্তা ঢাকায় পদায়ন পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ অবস্থায় সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে দায়িত্ব পেলেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কেন একই ধরনের সুযোগ পেলেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ই/এম শাখায় পদায়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ ও অভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি।

পদায়নপ্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ : অভিযোগে বলা হয়েছে, পদায়নের জন্য কর্মকর্তাদের ক্যাটাগরি বা গ্রেডিং নির্ধারণের দায়িত্বে ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বিপ্লব, নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিয়াউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অভিযোগকারীদের দাবি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তা নিজেদের জন্য উচ্চতর ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন নিয়েছেন।

আ ন ম মাজহারুল ইসলামকে নির্বাহী প্রকৌশলী, সংস্থাপন-১ এবং মো. জিয়াউর রহমানকে নির্বাহী প্রকৌশলী, সংস্থাপন-২ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের ভূমিকা এবং পদায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থের কোনো সংঘাত ছিল কি না, তা যাচাই করার দাবি উঠেছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পদায়নপ্রক্রিয়ায় যাঁদের নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল, তাঁদের বিরুদ্ধেই যদি নিজেদের সুবিধা নিশ্চিত করার অভিযোগ ওঠে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এ ক্ষেত্রে গ্রেডিংয়ের মূল নথি, কর্মকর্তাদের দেওয়া নম্বর, ক্যাটাগরি নির্ধারণের মানদণ্ড, দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ এবং লটারির কার্যবিবরণী প্রকাশের দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে এসব নথিই হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

শেরেবাংলা নগরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিভাগে পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন  : অভিযোগে আ ন ম মাজহারুল ইসলাম ও মো. জিয়াউর রহমানের পদায়নকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, লটারির দায়িত্বে থাকা দুই কর্মকর্তাই শেষ পর্যন্ত শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ ও বিভাগ-২-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পেয়েছেন।

শেরেবাংলা নগর এলাকার এসব বিভাগের আওতায় জাতীয় সংসদ ভবন, সংসদ সদস্যদের আবাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কাজ রয়েছে। ফলে এ ধরনের কর্মবিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং স্বচ্ছতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব পালনের পূর্ববর্তী রেকর্ড যাচাই করলে পদায়নের যৌক্তিকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।

একই কর্মকর্তার বারবার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পালনের অভিযোগ  : ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে কয়েকজন কর্মকর্তার ধারাবাহিক পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজিবুল ইসলাম আগে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, রাজউকে অথরাইজড অফিসার এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ উপবিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন।

পরে তিনি মহাখালী গণপূর্ত বিভাগ থেকে আবার ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন। আ ন ম মাজহারুল ইসলাম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, রেলওয়ে ডিভিশন-সংশ্লিষ্ট উপবিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, মাসুদ রানার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে দায়িত্ব পালনের পর পুনরায় রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়নের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের তথ্য অনুযায়ী, তিনি আগে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ এবং পরে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তী সময়ে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে বলে তালিকায় উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একই কর্মকর্তাদের বারবার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে ? তাঁদের অতীত পদায়নের ধারাবাহিকতা, দায়িত্ব পালনের মেয়াদ এবং অন্য কর্মকর্তাদের তুলনায় সুযোগ পাওয়ার ধরন যাচাই করা হলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। একইভাবে, পুনরায় পদায়নের ক্ষেত্রেও বিধি ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের বিষয়টি যাচাই করা জরুরি।

রাশেদা হাসানের পদায়ন নিয়েও অভিযোগ :অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্যে রাশেদা হাসান নামের এক কর্মকর্তার পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগে তাঁকে সাবেক মন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, তিনি ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালন করার পর মিরপুরে পদায়ন পান এবং পরবর্তী সময়ে আজিমপুরে দায়িত্ব পেয়েছেন। এ কারণে তাঁর পদায়নকে রাজনৈতিক প্রভাবের ফল হিসেবে নিশ্চিতভাবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সময়ে তাঁর পদায়ন আদেশ, প্রশাসনিক সুপারিশ এবং যোগ্যতার মূল্যায়ন যাচাই করলেই অভিযোগটির গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।

ঢাকার বাইরে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদায়ন  : ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও আলোচনায় : প্রাপ্ত তালিকায় ঢাকার বাইরে বিভিন্ন কর্মবিভাগে পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ২৭তম ব্যাচের আতিকুল ইসলাম (কুড়িগ্রাম), আব্দুস সাত্তার (লালমনিরহাট), মোহসিন (ফেনী) এবং জোয়ারদার তাবেদুন নবী (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)। অন্যদিকে, ২৪তম ব্যাচের স্বর্ণেন্দু শেখর মণ্ডলের মেহেরপুরে পদায়নের তথ্যও দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারীদের বক্তব্য, একদিকে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে অপেক্ষাকৃত নবীন কর্মকর্তাদের পদায়ন, অন্যদিকে জ্যেষ্ঠদের জেলা পর্যায়ে পাঠানোর ঘটনা পদায়নের নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে অসংগতি থাকলে তার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব।

নিয়োগবিধি ও পদোন্নতির মানদণ্ড কি উপেক্ষিত ?
বদলি-পদায়ন বিতর্কের পাশাপাশি সরকারি চাকরির নিয়োগবিধি, পদোন্নতির শর্ত এবং প্রশাসনিক ন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যাচ, জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতার তুলনামূলক মূল্যায়ন ছাড়াই কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে বদলি-পদায়ন এবং নিয়োগ বা পদোন্নতি এক বিষয় নয়। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির গুরুতর ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

১২০ কোটি টাকার অভিযোগ  :  পদায়নপ্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয়ের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিই পুরো ঘটনাকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগ এবং অন্যান্য পছন্দের পদে কর্মকর্তাদের পদায়নকে কেন্দ্র করে অনিয়মের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন, আর্থিক বিবরণী, পদায়নের নথি এবং অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য যাচাই করা যেতে পারে। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ : গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

তাঁদের দাবি, পদায়নের পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দেখা হোক—লটারি কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, কারা নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, ক্যাটাগরি নির্ধারণের মানদণ্ড কী ছিল এবং ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে পদায়নের সিদ্ধান্ত কোন ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগকারীদের উত্থাপিত ১২০ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের দাবির সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা পর্যালোচনা এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে – লটারির মূল তালিকা, বাক্সভিত্তিক নামের তালিকা ও কার্যবিবরণী সংগ্রহ করে যাচাই। কর্মকর্তা-ভিত্তিক ব্যাচ, জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতির তারিখ, পূর্ববর্তী কর্মস্থল ও বর্তমান পদায়নের তুলনামূলক বিশ্লেষণ।

ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও গ্রেডিংয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা পর্যালোচনা। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের প্রশাসনিক কারণ এবং সংশ্লিষ্ট শূন্যপদের বিবরণ প্রকাশ। ১২০ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের অভিযোগের পক্ষে আর্থিক ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই এবং প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে অনুসন্ধান। এবং অভিযোগে নাম আসা কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণ এবং তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ।

জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কি ?  গণপূর্ত অধিদপ্তর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। এ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে পদায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠা স্বাভাবিকভাবেই জনস্বার্থের বিষয়। বিশেষ করে যেসব বিভাগের আওতায় জাতীয় সংসদ ভবন, সরকারি আবাসন, হাসপাতাল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাজ পরিচালিত হয়, সেখানে দায়িত্ব বণ্টনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু বদলি-পদায়নের অনিয়ম নয়; বরং প্রশাসনিক জবাবদিহি, সরকারি চাকরির বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপরও প্রশ্ন তুলবে। আর অভিযোগগুলো অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও নথির ভিত্তিতে তা পরিষ্কার করার সুযোগ থাকা উচিত।

সুতরাং, লটারির নামে অনিয়ম, পক্ষপাতমূলক পদায়ন এবং ১২০ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা—অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নথিভিত্তিক যাচাই, প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা এবং প্রমাণসাপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করা হবে।

👁️ 164 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *