সংক্রমণের তীব্রতা

এইমাত্র জাতীয় জীবন-যাপন জীবনী সারাদেশ সাস্থ্য

দেশের ইতিহাসে করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড

 

এমএ স্বপন : দেশে করোনায় মৃত্যুর রেকর্ড প্রায় প্রতিদিনই ভাঙছে। টানা চতুর্থ দিনের মতো দেশে করোনায় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর দিলো স্বাস্থ্য অধিদফতর। করোনাভাইরাস নিয়ে সোমবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এটি দেশে এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যুর রেকর্ড। এর আগের তিন দিনে যথাক্রমে ১০২, ১০১, ১০১ জন করে মৃত্যুবরণ করেছিল।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪ হাজার ২৭১ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এতে দেশে এখন পর্যন্ত মোট করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২৩ হাজার ২২১ জনে।
এদিকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) থেকে গত শনিবার রাতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, করোনাভাইরাস মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশে সংক্রমণের তীব্রতা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে বয়স্ক বা আগে থেকে বিভিন্ন রোগে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা মানুষ এই তীব্রতার ধকল সইতে পারছে না বলেই মৃত্যু বেড়ে গেছে।
যদিও সংক্রমণের তীব্রতা ও দ্রুত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য দিতে পারছে না আইইডিসিআর। শুধু আগের মতোই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আইইডিসিআরের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাদের আগে থেকে নানা রোগের জটিলতা রয়েছে এবং যাদের বয়স তুলনামূলক বেশি, তাদের মধ্যে যারা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে তাদের মধ্য থেকেই মৃত্যু হচ্ছে বেশি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি রোগী মারা যাচ্ছে তীব্র শ্বাসকষ্টে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপও তাদের মৃত্যু ত্বরান্বিত করছে।
আফ্রিকান বা অন্য কোনো ভেরিয়েন্টের কারণে এবার সংক্রমণের তীব্রতা ও মৃত্যু দ্রুত ঘটছে কি না, এ বিষয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমীনা শিরীন বলেন, ‘আমাদের কাছে এ রকম কোনো নিশ্চিত তথ্য এখনো নেই। এ জন্য যে মাপের গবেষণা প্রযুক্তি দরকার, তা আমাদের এখানে নেই। আর এটি বের করা অনেকটাই সময়সাপেক্ষ। ফলে উপযুক্ত মাত্রায় গবেষণার ফলাফল ছাড়া কেউ যদি বলেন কোনো বিশেষ ভেরিয়েন্টের প্রভাবে সংক্রমণের তীব্রতা বেড়েছে বা দ্রুত মৃত্যু ঘটছে, সেটা সঠিক হবে না বা হচ্ছে না।’
প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত মার্চ মাসে (এক মাসে) যেখানে করোনায় মৃত্যু হয়েছে ৬৩৮ জনের, সেখানে চলতি এপ্রিল মাসে মাত্র ১৫ দিনে মারা গেছে ৯৪১ জন। অর্থাৎ আগের মাসের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩২.২ শতাংশ। অন্যদিকে গত বছর দেশে ২৪ ঘণ্টার হিসাবে যেখানে সর্বোচ্চ মৃত্যু উঠেছিল ৬৪ জনে, সেখানে এবার এই এপ্রিলের কয়েক দিনই দৈনিক মৃত্যু গত বছরের ওই সর্বোচ্চ দৈনিক মৃত্যুর চেয়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি হচ্ছে। এ ছাড়া এবার যারা মারা যাচ্ছে তাদের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মৃতদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫২ শতাংশ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যেই হাসপাতালে এসেছিল, আবার সর্বোচ্চ ৪৮ শতাংশ হাসপাতালে আসার পাঁচ দিনের কম সময়ের মধ্যে মারা গেছে। তবে সরাসরি উপসর্গ দেখা দেওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে মৃত্যুর হার মাত্র ১০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশের মৃত্যু ঘটছে পাঁচ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে এবং ২৬ শতাংশের মৃত্যু ঘটছে ২০ দিন পরে।
আইইডিসিআরের ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, মৃতদের মধ্যে পাঁচ থেকে ১০ দিনের মধ্যে হাসপাতালে এসেছিল ২৬ শতাংশ, ১১ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে এসেছিল ১২ শতাংশ, ১৬ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ২ শতাংশ এবং ২০ দিনের পরে এসেছিল ৮ শতাংশ। অন্যদিকে হাসপাতালে আসার পর ৩১ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে পাঁচ থেকে ১০ দিনের মধ্যে, ১২ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে ১১ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে, ২ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে ১৬ থেকে ২০ দিনের মধ্যে এবং ৬ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে ২০ দিনের পরে।
ওই প্রতিবেদনের আরেক অংশে দেখানো হয়েছে, এ বছর ২৮ জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত যারা আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৪ শতাংশই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে, বাকিদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে, ১৭ শতাংশ বাড়িতে এবং ৬ শতাংশ অন্যান্যভাবে চিকিৎসা নিয়েছে। এ ছাড়া এবার মৃতদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে নারীর সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে গত বছর জুলাই মসে যখন সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছিল দেশে, তখন ৮২ শতাংশ ছিল পুরুষ এবং বাকি ১৮ শতাংশ ছিল নারী। এবার এপ্রিলে এ পর্যন্ত যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশ পুরুষ এবং ৩০ শতাংশ নারী। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় নারীর মৃত্যু এবার ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, টানা চতুর্থ দিনের মতো দেশে করোনায় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর দিলো স্বাস্থ্য অধিদফতর। করোনাভাইরাস নিয়ে সোমবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এটি দেশে এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যুর রেকর্ড। এর আগের তিন দিনে যথাক্রমে ১০২, ১০১, ১০১ জন করে মৃত্যুবরণ করেছিল।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪ হাজার ২৭১ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এতে দেশে এখন পর্যন্ত মোট করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২৩ হাজার ২২১ জনে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, এদিন সুস্থ হয়েছেন আরও ৬ হাজার ৩৬৪ জন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ৬ লাখ ২১ হাজার ৩০০ জন।
এদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান রাখা ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্যানুযায়ী, সোমবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় বিশ্বে মারা গেছেন ৯ হাজার ৪১৮ জন এবং নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৯ হাজার ৪৩৭ জন। এ নিয়ে বিশ্বে মোট করোনায় মৃত্যু হয়েছে ৩০ লাখ ৩২ হাজার ৮৬২ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ কোটি ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৮ জন। এ ছাড়া সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১২ কোটি ৫৩ লাখ এক হাজার ৫৮১ জন।
করোনায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রে। তালিকায় শীর্ষে থাকা দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনা সংক্রমিত হয়েছেন ৩ কোটি ২৪ লাখ ৪ হাজার ৪৫৪ জন। মৃত্যু হয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ৬১ জনের।
আক্রান্তে দ্বিতীয় ও মৃত্যুতে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভারতে এখন পর্যন্ত সংক্রমিত হয়েছেন এক কোটি ৫০ লাখ ৭ হাজার ৭৬৭ জন এবং মারা গেছেন এক লাখ ৭৮ হাজার ৭৯৩ জন।
আক্রান্তে তৃতীয় এবং মৃত্যুতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্রাজিল এখন পর্যন্ত করোনায় এক কোটি ৩৯ লাখ ৪৩ হাজার ৭১ জন সংক্রমিত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৪২৪ জনের।
আক্রান্তের দিক থেকে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৫২ লাখ ৮৯ হাজার ৫২৮ জন। ভাইরাসটিতে মারা গেছেন এক লাখ ৭৩৩ জন।
আক্রান্তের দিক থেকে রাশিয়া রয়েছে পঞ্চম স্থানে। দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন ৪৭ লাখ ২ হাজার ১০১ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন এক লাখ ৫ হাজার ৫৮২ জন।
এদিকে আক্রান্তের তালিকায় যুক্তরাজ্য ষষ্ঠ, তুরস্ক সপ্তম, ইতালি অষ্টম, স্পেন নবম এবং জার্মানি দশম স্থানে রয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩৩তম।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২১৮টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে কোভিড-১৯।